সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ১০ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল, ‘পঁচিশে মার্চের পর শেখ মুজিবের সহিত মিলিয়া আন্দোলন শুরু করিব’। এর আগের দিন (৯ মার্চ) পল্টন ময়দানে বিরাট জনসভায় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবের নির্দেশিত ২৫ মার্চের মধ্যে কোনো কিছু না করা হলে আমি শেখ মুজিবের সঙ্গে মিলে ১৯৫২ সালের মতো তুমুল গণ-আন্দোলন শুরু করবো।’
দেশের সবশেষ অবস্থার পটভূমিতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি ন্যাপ নেতা ভাসানীর আহ্বান, ‘একদিন ভারতের বুকে নির্বিচারে গণহত্যা করে, জালিয়ানওয়ালাবাগের মর্মান্তিক ইতিহাস রচনা করে, অত্যাচার-অবিচারের বন্যা বইয়ে দিয়েও প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সরকারের শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। পাক-ভারত উপমহাদেশকে শত্রুতে পরিণত না করে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মধ্যে সরে যাওয়াই তারা মঙ্গলকর মনে করেছে। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একদিন সূর্য অস্ত যেতো না, রূঢ় বাস্তবতার কষাঘাতে সেই সাম্রাজ্যের সূর্যও আজ অস্তমিত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে তাই বলি- অনেক হয়েছে, আর নয়। তিক্ততা বাড়িয়ে আর লাভ নেই। লা-কুম দ্বী’নুকুম অলইয়া-দ্বীন’-এর (তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার) নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করে লও।’
স্বাধীন বাংলা আন্দোলন কমিটির উদ্যোগে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর স্বাক্ষরযুক্ত একটি প্রচারপত্রে ‘পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চিত জনসাধারণের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের আজাদী রক্ষা ও মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানানো হয়। এর আগের দিন (৯ মার্চ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে ভাসানীর কথা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহর (ইকবাল) হক হল ক্যান্টিনে ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরি সভায় ‘স্বাধীন বাংলা দেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। ইত্তেফাকে ১০ মার্চের প্রথম পাতায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে এই খবর। বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে উপনিবেশবাদী পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক নিহত ছাত্রলীগকর্মী ফারুক ইকবালসহ অন্য শহীদদের জন্য শোক প্রকাশ করা হয় সভায়।
রাজশাহীতে ৯ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রোজ রাত ৯টা থেকে আট ঘণ্টার জন্য (ভোর ৫টা পর্যন্ত) কারফিউ জারি করে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে বিবৃতি দেন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান। এক বিবৃতিতে অবিলম্বে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। ইত্তেফাকে ১০ মার্চের প্রথম পাতায় দুটি ভিন্ন খবরে এসব তথ্য প্রকাশিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সরকারি অফিস-আদালত জনশূন্য হয়ে পড়ার চিত্র ইত্তেফাকের ১০ মার্চের প্রথম পাতায় উঠে আসে তিনটি স্থিরচিত্রের কোলাজে। ‘সরকারি-আধা সরকারি কর্মকেন্দ্র অচল’ শিরোনামে একটি খবরে এর বিস্তারিত তথ্য ছিল। ঢাকা হাইকোর্ট, জজ কোর্ট, প্রাদেশিক সেক্রেটারিয়েট, ডেপুটি কমিশনারের অফিস, ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েট ও কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যান্য অফিস, ইপিআই, ওয়াপদা, ওয়াসাসহ সব সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও পাকিস্তান এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ রুট বন্ধ ছিল। ব্যাংক খোলা ছিল সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ করে হত্যার প্রতিবাদে ৯ মার্চ শহরের বাসাবাড়ি, বাস, রিকশা, দোকানপাট, সরকারি ও আধা-সরকারি অফিসে কালো পতাকা উড্ডীন দেখা যায়।
ইত্তেফাক/জেএইচ