স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমরা পৌঁছলাম। বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হচ্ছে। সুবর্ণজয়ন্তীর পূর্বমুহূর্তে জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দান যথাযথভাবেই সুবর্ণজয়ন্তীর জন্য বিশাল অর্জন।
স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছরই আমরা মার্চ মাসকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েই পালন করি। বঙ্গবন্ধু এ মাসেরই ৭ তারিখে ভাষণ দিয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে ইউনেসকো কর্তৃক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভাষণ বলে স্বীকৃত। যে ভাষণ সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে শক্তি জুগিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার। ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে অর্থাত্ ২৬শে মার্চ জাতির পিতা চূড়ান্ত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৩ তারিখ থেকেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন স্থানে, যেমন—চট্টগ্রামে ও ঢাকার গাজীপুরে। তবে ২৫ তারিখ রাতের ঘোষণার পর মানুষ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যা-ই হোক, আজ ৫০ বছর পর মনে হচ্ছে, আমরা আমাদের অনেক কিছুই হারিয়েছি। হারিয়েছি অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে। হারিয়েছি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে। একই সঙ্গে হারিয়েছি চার নেতাসহ অনেক দেশপ্রেমিক নেতাকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে পাকিস্তানের মতো আবার সামরিক নেতারা বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয়। দেশের মানুষ সব জানে, তবে এইটুকু বলতে চাই, ২০০৮ সাল থেকে জনগণ আওয়ামী লীগকে এবং বাঙালিদের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ হাসিনাকে তাদের বিশ্বাস ও আস্থার ম্যান্ডেট তুলে দেয়। এবং সত্যি সত্যি আমরা ১১ বছর ধরে ধাপে ধাপে সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে আজ সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পেরেছি। এজন্য বলছিলাম, সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছি। আমাদের উপলব্ধি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়নে তার কন্যাই মানুষের মনে আনন্দ ও উত্সাহ জুগিয়েছে। আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।
আজকে এই মার্চ মাসে আর একটি কথা বলতে চাই, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় এদেশের রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের তালিকা করে দিচ্ছে এবং মুক্তিযুদ্ধের তালিকা নিয়ে তারা ব্যস্ত। তাই মাননীয় মন্ত্রীর কাছে একটি অনুরোধ, এই মার্চ মাসের ২৩-২৪ তারিখের দিকেই চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের যে ১০ জন সাহসী তরুণ কর্মকর্তা ট্রান্সমিটার দিয়ে গোপন এক স্থান থেকে স্বাধীন বাংলা বেতারের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটাই ছিল আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার বিশাল কৃতিত্ব। ২৬ তারিখ তারা চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান সাহেবকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ যে সারা দেশে শুরু হয়ে গেছে এবং বাঙালিদের হতাশ না হয়ে পাকিস্তানিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে তারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
এখানে উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ১ কিলোওয়াট প্রচারযন্ত্রে চট্টগ্রাম ও তার চারপাশের কিছু অংশের লোকজন শুনেছিল। তারা তখনই ভাবলেন যে, আমাদের সারা দেশের মানুষকে এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। তাই তারা বহু কষ্টে গোপনীয়ভাবেই ১০ কিলোওয়াটের প্রচারযন্ত্র সংগ্রহ করেন। ২৭ তারিখে আমরা যে ঘোষণার কথা শুনেছি, মানে জিয়াউর রহমানকে দিয়ে যে ঘোষণা পাঠ করিয়েছিল ২৭ তারিখ সন্ধ্যা ৭টায়, তা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ তখন শুনেছিল। এই কৃতিত্বটা জিয়াউর রহমানের ছিল না। ছিল এই ১০ জন বেতারকর্মীর। এরা হলেন :স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদ এবং তার অন্য ৯ জন সহকর্মী যথাক্রমে—সৈয়দ আব্দুস সাকের, মোস্তফা মনোয়ার, আব্দুল্লাহ আল ফারুক, আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, আমিনুর রহমান, রাশেদুল হোসাইন, এ এম শরাফুজ্জামান, কাজী হাবীব উদ্দিন ও রেজাউল করিম চৌধুরী। এদের সঙ্গে সহভূমিকা রেখেছিলেন বেগম মোস্তারি শফী, ডা. মোহাম্মদ শফী, ডা. সৈয়দ আনোয়ার আলী, প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম ও দিলীপ চন্দ্র দাস।
ডা. মোহাম্মদ শফী তার বাড়িতে আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুল অস্ত্রশস্ত্র রাখার দায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি মনে করি, এদের সবাইকে, সেদিনের এই ঘটনাকে যথাযথ মর্যাদায় আজকের প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হোক। স্বাধীনতার সত্যিকারের ইতিহাস সঠিকভাবে মানুষ জানুক। বেলাল মোহাম্মদের লিখিত সেই ২৭শে মার্চের ঘোষণা লেখার কৃতিত্বটি পেয়েছেন একজন সামরিক অফিসার। তা বেলাল মোহাম্মদ ও মোস্তারি শফীর স্মৃতিচারণ গ্রন্থে সত্যিকারের ইতিহাসটি বিবৃত রয়েছে। সেটাকেও আবার জাতির সামনে তুলে ধরুন। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মিথ্যা প্রচার তাহলেই জাতির কাছে স্পষ্ট হবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক : চিত্রশিল্পী