আজ আমরা কিছুই লিখিতে বা বলিতে চাহি না। কারণ, আমাদের পূর্বসূরিরা যাহা লিখিয়া গিয়াছেন, বলিয়া গিয়াছেন, আমরাও যাহা বলিয়া আসিতেছি তাহা কোনো ক্ষেত্রেই কোনো কাজে আসে নাই; যাহাদের শুনিবার কথা তাহাদের কর্ণগোচর হয় নাই। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায়, এই সমাজে যাহাদের দায়িত্ব লইয়া শুনিবার কথা তাহারাই উপেক্ষা করিয়া আসিতেছেন। সকল কিছু দেখিয়া কবির একটি পঙিক্তই আমাদের মনে দাগ কাটিয়া যায়, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’ আমরা কবির ঐ প্রথম পঙিক্তটিই কেবল বিবেচনায় লইতে পারি। সত্যিই বুঝি এমন দেশ মেলা ভার। যেইখানে অনিয়মই নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহাতে কেহ দায়িত্বও যেমন বোধ করেন না, তেমনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অপারগতার জন্যও কাহারো অস্বস্তি নাই। এই যে ঢাকা শহরের অলিগলি হইতে শুরু করিয়া প্রশস্ত সড়কের আশপাশে ঝুলিয়া আছে হাজার হাজার বিদ্যুতের, ডিশের, টেলিফোনের তার, তাহা অপসারণ করিবার কথা শুনা যাইতেছে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া; কিন্তু কোনো পরিবর্তন হইয়াছে কি? কতবার আমরা বলিয়াছি, পাঁচ টনের ট্রাক ৪০ টন মাল বোঝাই করিয়া বেইলি ব্রিজের উপর দিয়া পার হইতেছে, যাহা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দেশব্যাপী এই ভারী মালবাহী ট্রাকের কারণে অনেক বেইলি ব্রিজ ভাঙিয়া পড়িয়াছে। এই অপকর্ম কি বন্ধ হইয়াছে? অবকাঠামো উন্নয়নে ঠিকাদারি কাজ লইয়া তাহার পর কাজ অসম্পূর্ণ রাখিয়া অধিকাংশ বিল তুলিয়া লইয়া ঠিকাদার কাজ ফেলিয়া রাখিতেছেন। একজনের লাইসেন্সে আরেক জন কাজ লইয়া দায়িত্ব পালন করিতেছেন না। আমরা বহুবার লিখিয়া বিস্তর কলমের কালি ক্ষয় করিয়াছি, কাগজের স্থান নষ্ট করিয়াছি। ঐ সকল কাজ তদারকির জন্য স্তরে স্তরে কর্মকর্তা, কর্মচারী রহিয়াছেন যাহাদের রাজস্ব হইতে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়; অবসর গ্রহণের পর মোটা অঙ্কের অবসরভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার হইতে দেওয়া হয়। তাহাদের কাহারো কর্ণগোচর হইয়াছে কি? নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ কেন ২০ শতাংশও বাস্তবায়িত হয় না তাহার জবাব দিবেন কে? দেশে নানাভাবে চলিতেছে নদীদূষণ। সরকার বহু অর্থ ব্যয় করিয়াছে এবং করিতেছে এই দূষণ হইতে নদীগুলিকে মুক্ত করিবার জন্য; কিন্তু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা লওয়া গিয়াছে কি? তেমনি দখলদারি উচ্ছেদ, চাঁদাবাজি বন্ধ, খাদ্যে ভেজাল, পণ্যমূল্যে অনিয়ম—ইহার সকল কিছু বারংবার লিখিয়াও, কান্নাকাটি করিয়াও কোনো পরিবর্তন আমরা আনিতে পারি নাই।
শুধু বাংলাদেশ নহে, গোটা উন্নয়নশীল বিশ্বের চিত্র একই রকম। এমনিতেই উন্নয়নশীল বিশ্বের নুন আনিতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, তাহার উপর করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বহু দেশের অর্থনীতিতে নামিয়াছে ধস। ফলে বিশৃঙ্খলা আরো বিস্তার লাভ করিয়াছে। বর্তমানে করোনার ভ্যাকসিন লইয়া দেশগুলিতে বিশৃঙ্খলা রোধ করা যায় নাই। বরং এই ভ্যাকসিন হইয়া উঠিয়াছে কাহারো জন্য আশীর্বাদ, কাহারো জন্য সর্বনাশ। উপরন্তু ভ্যাকসিন লইয়াও দেশে দেশে একদিকে চলিতেছে বিলয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, অন্যদিকে চলিতেছে নানা ধরনের মিথ্যাচার। সুতরাং সকল ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খল অবস্থা অপরিবর্তিত রহিয়াছে। সুতরাং আমরা ভাবিতেছি বলিয়া লাভ কী? তাহার পরও বলিতে হয়, তাই বলা। এত হতাশার পরও আমরা আশা ছাড়ি নাই, আশাহত হই নাই। যদিও সময় অনেক অতিবাহিত হইয়াছে, তবুও আমরা বিশ্বাস রাখিতে চাই যে, ধীরে ধীরে সকল কিছুই পরিবর্তন হইবে। একসময় যাহা ছিল না তাহা যেমন আজ আছে, তেমনি আজ যাহা নাই তাহা আগামী দিন আসিবে।