সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি অন্য আরেক যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের উত্সাহ-উদ্দীপনা ও সাহস জুগিয়েছে; জুগিয়েছে সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে অনুপ্রেরণা এবং হানাদার জল্লাদ বাহিনীকে সর্বক্ষণ রেখেছে ভীতসন্ত্রস্ত। আর এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়া হয়েছে একমাত্র বেতার কেন্দ্র থেকে। এই বেতার কেন্দ্রই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আর এই বেতার কেন্দ্রের একজন কণ্ঠসৈনিক ছিলাম আমি, যার জন্য নিজেকে গর্বিত মনে করি।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী বাংলার মানুষের ওপর নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। এদিন তারা প্রথমেই গ্রেফতার করে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি গ্রেফতারের আগমুহূর্তে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার ঘোষণার পর দেশে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধে যোগদান এবং বর্বর খুনিদের হাত থেকে রক্ষার জন্য অসংখ্য মানুষ দেশ ত্যাগ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই আমিও বসে থাকতে পারিনি। যোগাযোগ করতে থাকি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জনের সঙ্গে। ইতিমধ্যে সংবাদ পেলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
সংবাদ পেয়ে চলে যাই আগরতলায়। বহু কষ্ট করে কুমিল্লার দাউদকান্দি-আড়িখোলা হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের আগরতলা পৌঁছাই। সেখানে গিয়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ি। তখন মাত্র ১৮ বছর বয়সের তরুণ তাজা যুবক, ঢাকা ডেন্টাল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। এই বয়সে নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াটাই স্বাভাবিক।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান করার পর একজন কণ্ঠ সৈনিক হিসেবে সংগীত পরিবেশনই ছিল আমার মূল কাজ। বহু সংগীত পরিবেশন করেছি ৯ মাসে। এর মধ্যে এককভাবে এবং দ্বৈতভাবে সংগীত পরিবেশন করি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত আমার প্রথম দ্বৈতসংগীত ‘জ্বলছে জ্বলছে প্রাণ আমার দেশ আমার...’।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এম আর আক্তার মুকুলের চরমপত্র পাঠ ছিল উদ্দীপনামূলক ও জাগরণী অনুষ্ঠান। এই ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠানটি বাঙালিদের সেই দুর্দিনে দুঃসময়ে মনে হাসির উদ্রেক সৃষ্টি করত। চরমপত্র লিখতেন এবং পাঠ করতেন এম আর আক্তার মুকুল। আর এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন আব্দুল মান্নান। চরমপত্র ছাড়া আরো বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান নিয়মিত প্রচারিত হতো। এ সমস্ত অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল অগ্নিশিখা, রক্তসাগর, বিশ্ব জনমত, দর্পণ প্রভৃতি।
এই বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিকরা সাড়ে ৭ কোটি মুক্তিকামী স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালির মনোবলকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ক্ষুরধার প্রচার মুক্তিযুদ্ধকে করেছে গতিশীল। এগিয়ে নিতে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করেছে মুক্তিযুদ্ধের গতিকে। এই বেতার কেন্দ্রের প্রতিটি শব্দ ইথার ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে একেকটি বুলেট হয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইউনিটগুলো এবং শত্রুকবলিত এলাকার সঙ্গে যোগসূত্র বজায় রেখেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা প্রথম প্রচারিত হওয়ার এক ঘণ্টাকালের মধ্যে বিবিসি ও ভয়েজ অব আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সংবাদ বিশ্ববাসীর কাছে ছড়িয়ে পড়ে।
সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি যখন পাকিস্তানি খুনিবাহিনীর কবলে পড়ে মৃত্যুর দিন গুনছিল, ঠিক তখনই প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই বেতার কেন্দ্র দীর্ঘ ৯ মাস ধরে অমিত তেজ ও তেজস্বিনী ভাষা আর দৃপ্ত কণ্ঠে অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালির অতন্দ্র প্রহরী মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা দিয়ে, শক্তি দিয়ে, সাহস দিয়ে, দিশেহারা মুক্তিকামী বাঙালিকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। বিশ্বের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে এত বড় অবদান আর কোনো বেতার কেন্দ্র রাখতে পেরেছে কি না, তা আমাদের জানা নেই। সত্যি সত্যি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির অগ্রদূত হিসেবে শুধু মুক্তিযুদ্ধে নয়, এদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বর্তমান বাংলাদেশ সরকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সব শব্দসৈনিককে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছে, এর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে জানাই আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া অনেক গৌরবের, বীরত্বের ও সম্মানের।
লেখক :একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা
ইত্তেফাক/এসআই