১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (১২ মার্চ)

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র।  বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ১২ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার মূল খবরের শিরোনাম ছিল, ‘ভুট্টোর প্রাণ কাঁদিতেছে তবু—’।  বাংলার শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘প্রাণ কাঁদিলেও’ শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠানো তারবার্তায় অবস্থার কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। জাতীয় পরিষদে যোগদানের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু যে চার দফা সুস্পষ্ট দাবি জানিয়েছেন, সে সম্পর্কে ভুট্টো পূর্ণ নীরবতা পালন করেছেন। ১১ মার্চ রাতে পাঠানো তারবার্তায় তিনি বলেন, ‘যে ভয়াবহ বিপর্যয় দেশকে গ্রাস করে বসছে, তা থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদের উভয়ের ওপর এক বিরাট দায়িত্ব বর্তেছে।  মানুষের পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব তার সবই আমাদের করতে হবে।’

হাসান শাহরিয়ারের লেখা মূল প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বাংলাদেশে বিপ্লবের ফলে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো গুরুতর বাধার সম্মুখীন হয়েছেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে নিজের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন। বর্তমান সংকটের জন্য ভুট্টোর অগণতান্ত্রিক, অবিবেচনাপ্রসূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহারকে দায়ী করা হয়েছে বলে তিনি গা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। আগামী ১৪ মার্চ করাচিতে জনসভায় বিরূপ মনোভাবাপন্ন জনতার সম্মুখে বক্তৃতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন। 

ইত্তেফাকের ১২ মার্চের প্রথম পাতায় মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে ‘ভুটোর তার’ শিরোনামের খবরে জানানো হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো অবিলম্বে ঢাকা সফরে আসতে রাজি আছেন। যদিও তিনি কোনো তারিখ ঘোষণা করেননি। ধারণা করা হচ্ছে, ১৩ মার্চ তিনি বাংলাদেশের রাজধানীতে আসতে পারেন। 

মূল প্রতিবেদনের শিরোনামের নিচে রাখা একটি খবরের শিরোনাম করা হয়, ‘চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা রক্ষা করিতে হইবে’। সংবাদমাধ্যমকে ১১ মার্চ দেওয়া পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদের একটি বিবৃতি নিয়ে সাজানো হয় প্রতিবেদনটি। খবরটিতে জানানো হয়, হরতালের ক্ষেত্রে অব্যাহতির আওতা সম্প্রসারিত হয়েছে। 

তাজউদ্দিন আহমদ বিবৃতিতে বলেন, ‘জনগণের আন্দোলন নজিরবিহীন তীব্রতা লাভ করেছে। বাংলাদেশের জনগণের নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেসব নির্দেশ দিয়েছেন, প্রত্যেকে আপন আপন স্থানে থেকে পবিত্র দায়িত্বজ্ঞানে সেসব কার্যকর করে তুলেছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। জীবনের প্রতিটি স্তরের লোকজনের এই দায়িত্ববোধ সবার জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস। এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ হারে উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং আমাদের অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে চাঙ্গা রাখার জন্যও আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করার এবং আমাদের বুভুক্ষু জনসাধারণকে দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত করার কায়েমী স্বার্থবাদী এবং গণবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য অর্থনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে জড়িত সব লোক প্রতিটি ক্ষেত্রে অবশ্যই সুকঠোর শৃঙ্খলা প্রদর্শন করবে।’

১৯৭১ সালের ১২ মার্চ ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় হরতালের ঢাকা-১ ও হরতালের ঢাকা-২ শিরোনামে দুটি স্থিরচিত্রে তুলে ধরা হয়, চিফ সেক্রেটারির বাসভবন ও প্রধান বিচারপতির বাসভবনে কালো পতাকা। চিফ সেক্রেটারির বাসভবনে ওড়া কালো পতাকার ছবির নিচে একটি খবরের শিরোনাম ছিল, “কুর্মিটোলা মার্শাল ল’ অফিস ছাড়া কোথাও পাকিস্তানি পতাকা দেখি নাই”। এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খানের বক্তব্য এটি। তিনি বঙ্গবন্ধুকে কার্যত সরকার হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘সব সরকারি কর্মচারী ও সেক্রেটারি শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করে চলছেন। সরকারের এখন উচিত শেখ সাহেবের পূর্বশর্তগুলো মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কারণ গত ২৩ বছর ধরে অপমানিত ও নিস্পেষিত হওয়ার যে ধারণা বাঙালিদের মনে বাসা বেঁধেছে তার ফলে এর বিন্দুমাত্র রদবদলে তাদের সন্তুষ্ট করা যাবে না। পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানই সবশেষ যোগসূত্র।’

‘কঠিন বাস্তবকে উপলব্ধি করুন’ শিরোনামের খবরে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের প্রতি জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খানের বিবৃতি তুলে ধরা হয়। দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ২৩ বছরের সম্পর্কের বহু উত্থান-পতন ও ঘাত-সংঘাতের ইতিহাস মনে করিয়ে দেন তিনি। তার কথায়, ‘জোর করে কৃত্রিম সম্প্রীতি রক্ষার প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। রক্তপাত ও হানাহানির পথ পরিত্যাগ করুন।’

‘আর বিলম্ব নয়’ শিরোনামের প্রতিবেদনে জানানো হয় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি পাকিস্তান জুট অ্যাসোসিয়েশনের (পিজেএ) আবেদন। ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত সংগঠনটির জরুরি সভায় গৃহীত এক প্রস্তাবে একতরফাভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতকরণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে নিরস্ত্র জনগণের ওপর শক্তিপ্রয়োগের কারণে উদ্ভুত বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি ইয়াহিয়া খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারবার্তা পাঠায় পিজেএ।

ইত্তেফাকে ১২ মার্চের প্রথম পাতায় ‘সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করুন’ শিরোনামের খবরে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর আহ্বান তুলে ধরা হয়। টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী হাইস্কুল ময়দানে ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি সমর্থন দিয়ে ন্যাপ প্রধান বলেন, ‘পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনোরকম বিভেদ থাকা উচিত নয়। পূর্ব বাংলার জনগণ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বাঙালির স্বার্থের প্রশ্নে আপোস করার দিন চলে গেছে।’ তিনি সর্বস্তরের জনগণকে একত্রিত হয়ে লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম পরিচালনার আহ্বান জানান। 

দৈনিক ইত্তেফাকের চট্টগ্রাম অফিসের মইনুল আলমের লেখা ‘গম ভর্তি জাহাজের গতি পরিবর্তন করিয়া করাচি যাত্রা’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন স্থান পায় ১২ মার্চের প্রথম পাতার মাঝামাঝিতে। এতে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য গমবাহী জাহাজ ভিনটেজ হরিজন (৩২০০০ টন) যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামীকাল (১৩ মার্চ) চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু জাহাজটির গতিপথ করাচি অভিমুখে পরিবর্তিত করা হয়েছে বলে বন্দরের লিটারেজ কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তারবার্তায় এ তথ্য জানা যায়। তবে কার নির্দেশে জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে তা জানা যায়নি। 

পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্টোরেজ ও মুভমেন্ট দফতরের পক্ষে জাহাজটির মাল খালাসের কন্ট্রাক্টর মেসার্স গোল্ডেন শিপিং লাইনস-এর মুখপাত্র ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে জানান, ভিনটেক হরিজনের ক্যাপ্টেনের পাঠানো ২৮ ফেব্রুয়ারির (১৯৭১) তারবার্তায় বলা হয় জাহাজটি ১২ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়বে। কিন্তু ৯ মার্চ পাঠানো তারবার্তায় ক্যাপ্টেন জানান, জাহাজটির গতিপথ করাচি অভিমুখে পরিবর্তন করা হয়েছে।

ইত্তেফাকে ১২ মার্চের প্রথম পাতায় অষ্টম কলামে প্রকাশিত খবরের শিরোনাম ছিল ‘আঁতে ঘা’। এতে একসঙ্গে দুটি খবর জানানো হয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের নিউজপ্রিন্ট পশ্চিম পাকিস্তানে চালান বন্ধ রয়েছে। এ কারণে করাচি ‘ডন’সহ পশ্চিম পাকিস্তানের বেশিরভাগ সংবাদপত্রের কলেবর ১৪ পৃষ্ঠা থেকে হ্রাস পেয়ে চার পাতায় নেমে এসেছে। করাচি শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আহমদ আব্দুল্লাহ অবিলম্বে উত্তরাঞ্চলের মধ্যে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক ব্যাংকিং সেবা পুনরায় চালুর ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানান। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে পাঠানো তারবার্তায় তিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছেন।  এ দুটি খবর তুলে ধরতে ‘আঁতে ঘা’ শিরোনাম ব্যবহার করে তীর্যকভাবে দেখেছে ইত্তেফাক। 

ইত্তেফাক/জেএইচ