অণুগল্প দেবদূত

 

গ্রিসের পিরগস শহরটা ছোট। এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই, পুরো শহর পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা যায়। পিরগসে পৌঁছবার পরদিন সন্ধ্যায় শহরের প্রায় শেষ প্রান্তে এক চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমি স্থানীয় একজন মানুষের খোঁজ করছিলাম। নভেম্বরের শেষে শীতের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে, সন্ধ্যাও নেমেছে  অনেক আগে। পথটা একেবারেই জনমানব শূন্য। যখন কারো সাক্ষাত্ পাবার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি ঠিক সেই সময় বাঁ দিকের অন্ধকার গলিপথ থেকে কালো ওভারকোট এবং মাথায়  কালো টুপি পরা  দীর্ঘদেহী একজন যেন হাওয়ায় ভেসে সামনে এসে উপস্থিত হলেন।

আমার গ্রিক জানা নেই। ইংরেজিতে শুরু করব কি না ভাবছি এমন সময় ভদ্রলোক পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন, ‘ইউ আর পসিবলি লুকিং ফর সামথিং! মে বি এ প্লেস অর এ পারসন?’

‘রাইট ইউ আর। আই অ্যাম অ্যাকচুয়ালি লুকিং ফর দ্য গ্রেভইয়ার্ড।’

‘রিয়েলি?’ হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। মাথার কালো ক্যাপটা টেনে একটু নিচে নামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কবরস্থান তো মৃতদের জন্য। আপনার নিজের নিশ্চয়ই এখনো কবরে যাবার সময় হয়নি।’

‘বলা তো যায় না কার কখন কবরস্থানে যেতে হয়!’ গোরস্তানের কাছে আমার এক পুরোনো বন্ধুর খোঁজে বেরিয়েছি তাকে সে  কথা না বলে আমিও একটু রসিকতা করলাম।

‘মৃত্যুর পরে কবরস্থানে পৌঁছানো থেকে শুরু করে শেষকৃত্যের যাবতীয় দায় জীবিতদের। তুমি ইচ্ছে করলেও পা বাড়িয়ে কবরে ঢুকে পড়তে পারবে না।’

‘আসলে আমি এই শহরে নতুন এসেছি, গ্রেভইয়ার্ডের কাছে একটা ঠিকানায় পৌঁছাতে চাই।’

এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘মিনিট তিনেক সোজা হেঁটে প্রথম ডাইনে যে পথটা বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সেই রাস্তা ধরে সামান্য এগোলে বাঁ দিকে পাবে অ্যাঞ্জেলিকান চার্চ আর তার সাথেই গ্রেভইয়ার্ড। আর যদি রোমান ক্যাথলিকদের কবরখানায় যেতে চাও তাহলে পেছনে ফিরে শহরের দিকে পাঁচ সাত মিনিট হাঁটলে দেয়াল দিয়ে ঘেরা বিশাল এলাকা জুড়ে যে সমাধিক্ষেত্র সেটি শহরের সবচেয়ে বড় গ্রেভইয়ার্ড।’                                       

আমার একটু কৌতূহল হলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে মুসলিম বা ইহুদিদের কোনো কবরস্থান নেই?’                                

‘ইহুদি সিনাগগের সাথে একটা কবরস্থানও আছে। কিন্তু এই শহরে কোনো মুসলিম গ্রেভইয়ার্ড নেই।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘সিনাগগ, প্যাগোডা, গির্জা কিংবা মসজিদ-মন্দির এসবই জীবিতদের সমস্যা। কাউকে কবরস্থানে সমাহিত করো, চিতায় তুলে পুড়িয়ে দাও কিংবা জৈনদের মতো মরদেহ পাখিদের দিয়ে খাইয়ে দাও, তাতে সেই মৃত মানুষটার কিছুই এসে যায় না।’

‘বাট স্যালভেশন অব দ্য সোল, আত্মার মুক্তি বলে যদি কিছু থাকে তার জন্যে প্রার্থনা বা আনুষ্ঠানিকতার কোনো প্রয়োজন নেই?’ আমি জানতে চাই?

‘মৃতদেহ পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেলে কিংবা পচে গেলে মাটিতে মিশে গেলে তার সাথে বিমূর্ত আত্মার কী সম্পর্ক? অবশ্য আত্মা বলে যদি সত্যিই কিছু থাকে!’ কণ্ঠের গাঢ় আওয়াজের সাথে একটা রহস্যময় হাসি খেলে যায় কালো ওভারকোটের কালো ক্যাপের নিচের ঠোঁটে।

ঠান্ডার ভেতরেই হঠাত্ ভয়ে আমার হাত-পা আরো ঠান্ডা হয়ে আসে। যার সাথে এতোক্ষণ কথা বলছি তার পরিচয়ই তো জানা হয়নি। কণ্ঠের ভীতি লুকিয়ে আমি স্বাভাবিক গলায় বলে উঠি, ‘আপনার পরিচয়টা কিন্তু এখনো জানা হয়নি।’

‘আই অ্যাম অ্যান অ্যাঞ্জেল, দেবদূত!’

আমি বিস্ময়ের সাথে তার দিকে তাকাই। সম্ভবত আমার চোখের অবিশ্বাস তিনি পাঠ করতে পেরেছিলেন। মৃদু হেসে বলেন, ‘আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ।’

পরমুহূর্তে দুই হাত প্রসারিত করে তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। দেবদূত প্রকৃতপক্ষে কোন ধর্মে বিশ্বাসী তা আর জানবার সুযোগ হলো না।