ইউরোপীয়দের সুখের অনুভূতিই কি পালটে গেছে?

n শফিকুর রহমান রয়েল

 

আগেই ভালো ছিল না, নাকি এখন ভালো আছে? দীর্ঘ সময় পর এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাচ্ছে ইউরোপীয়রা। অর্থনৈতিকভাবে ভালো বা খারাপ থাকার উপলব্ধি ক্ষমতাই কি তারা হারিয়ে ফেলেছে, না, উপলব্ধির ধরন বদলে গেছে, এ নিয়েই গবেষকরা গবেষণার প্রয়োজনীয়তা টের পাচ্ছেন। জিডিপির ভিত্তিতে আগের চেয়ে ভালো না থাকার কোনো কারণ নেই; কিন্তু জিডিপির পরিমাণই যে সমৃদ্ধির প্রতিফলন ঘটায় না, তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে ব্যক্তি বা পরিবারের সুখের তুলনামূলক যাচাইয়ে। প্রথাগত জিডিপি দিয়ে ঢালাও মন্তব্য করার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে। প্রথম বিশ্ব চলাকালীন সময়ে উদ্ভাবিত জিডিপি সৈন্য সংযোজন ও যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষমতা নির্ণায়ক মাপনী হলেও এখন পর্যন্ত এটি ব্যবহূত হয়ে আসছে উন্নয়ন যাচাইয়ের কৌশল হিসেবে। এরই মধ্যে টেমস ও রাইয়ের মতো নদীগুলোর জল অনেক গড়িয়েছে। সাবেক পূর্ব ইউরোপ থেকে সমাজতন্ত্রের বিদায়—দেখতে দেখতে কেটে গেল ত্রিশেরও বেশি বছর।

বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ১৪টি দেশসহ ইউরোপের মোট ১৭টি রাষ্ট্রের ওপর পিউ রিসার্চ ইনস্টিটিউট গবেষণা চালিয়ে বের করে এনেছে কেন্দ্রীয় ও পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ লোক গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতিকে আলিঙ্গন করলেও তাদের এ সমর্থন সর্বজনীন দৃঢ়তা বেশ খানিকটাই দূরে। উদাহরণস্বরূপ পোল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্রের ৮৫ শতাংশ লোকই গণতন্ত্রের ফলশ্রুতিতে আসা পরিবর্তনকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়ে সমর্থন করলেও বুলগেরিয়া, ইউক্রেন ও রাশিয়ার ৫৫ শতাংশেরও কম লোক গণতান্ত্রিক পরিণতি নিয়ে ওরকম উন্মাদনা প্রকাশ করছে।

অধিকাংশ পোলিশ, চেক ও লিথুনিয়ান এবং হাঙ্গেরিয়ান ও স্লোভাকদের মধ্যে ৪০ শতাংশ লোকই এখন মনে করে ৩০ বছর আগের তুলনায় এখন অনেকটাই ভালো আছে। অন্যদিকে রাশিয়া, ইউক্রেন ও বুলগেরিয়ার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মনে করছে এখনকার চেয়ে ৩০ বছর আগেই বরং ভালো ছিল। কেন্দ্রীয় ও পূর্ব ইউরোপের লোকজনকে জিগ্যেস করা হয়েছিল, তারা প্রধানত কিসের ভিত্তিতে বলছে যে, ৩০ বছর আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো আছে? ৬৫ শতাংশই বেছে নিয়েছে শিক্ষাকে, তারা মনে করে আগের তুলনায় শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ৬১ শতাংশের অভিমত, উন্নয়ন ঘটেছে জীবনমানের। জাতীয় গর্ব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করে ৫৮ শতাংশ লোক। এবার উলটে দিকটা দেখি, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তুষ্ট ৪৪ শতাংশ লোক। পারিবারিক মূল্যবোধের অবনতি ঘটেছে বলে মনে করে শতকরা ৪১ জন লোক। সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে। ৫৩ শতাংশ লোকের দৃঢ়বিশ্বাস, সমাজতান্ত্রিক যুগ পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যসেবার মানের নাটকীয় অবনতি ঘটোছে।

ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ আসলে আবার পশ্চিমের চেয়ে পূর্ব ইউরোপের লোকেরা বেশি আশাবাদী। ৬০ শতাংশ পোলিশ, ইউক্রেনিয়া ও লিথুয়ানিয়ান মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, তাদের সন্তানেরা তাদের চেয়ে ভালো মানের জীবনযাপন করবে। গ্রিস, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মাত্র ২৫ শতাংশ অভিভাবক মনে করে, তাদের সন্তানেরা তাদের মতো এত উন্নত জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে না। সেন্ট্রাল ও ইস্টার্ন ইউরোপের দেশগুলো ইইউতে যোগদান করার পর ৮০ শতাংশ লোকই তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। কিন্তু পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ায় এ ভুল ভাঙতে খুব বেশিদিন লাগল না। সে জায়গায় গণতন্ত্রের গুণকীর্তন করে মাত্র ২৫ শতাংশ লোক।

গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতিকে গুণকীর্তন করা লোকের অভাব ছিল না পোল্যান্ডে। সমাজতন্ত্র দূর হওয়ার পর পোল্যান্ডের ১২ শতাংশ লোককে গণতন্ত্রের ব্যাপারে ১০ নম্বরের মধ্যে মার্কিং করতে বলা হয়েছিল। বেশির ভাগই নম্বর দিয়েছিল ৭, ৮.৯ ও ১০। আজ ৫৬ শতাংশ লোকই ঐ অবস্থানে নেই। তারা মন করে বার্লিন ওয়ালের পতন ও গণতন্ত্রকে স্বাগত জানানোর পেছনে তাদের মধ্যে যে মোহ কাজ করেছিল, তা এখন খুব কম লোকের মধ্যেই অবশিষ্ট রয়েছে।      — ইনভেস্টোপিডিয়া অনুসরণে