‘বায়োচার’ :কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি ও সম্ভাবনা

বায়োচার এক ধরনের কয়লা যার মধ্যে ৩৫ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ কার্বন থাকে। এই কয়লা এক ধরনের চুলায় (‘কৃষিবন্ধুচুলা’) ৩০০-৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় স্বল্প অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এবং পাইরোলাইসিস পদ্ধতিতে বায়োমাস পুড়িয়ে বায়োচার তৈরি করা হয়।

‘বায়োচার ইনরিচ অর্গানিক ফার্টিলাইজার’ বা ‘কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার’-এ সার মাটির খরা, অম্লত্ব ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করে মাটির স্থায়ী স্বাস্থ্যরক্ষা করে এবং মাটিতে অবস্থিত বিষাক্ত আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, সিসা ইত্যাদি ফসলে ঢুকতে বা আসতে দেয় না। ফলে ফসলের উত্পাদন ও গুণগত মান বাড়িয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এ সার মাটিতে বসবাসকারী অণুজীবের সংখ্যা শত শত গুণ বাড়িয়ে দেয় এবং মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করে। এটি রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমায়  ৩৫-৪০ শতাংশ, যার ফলে উত্পাদন করচ কমে আসে। ‘কার্বনসমৃদ্ধ জৈব সার’ ব্যবহারে বিষমুক্ত ফসল উত্পাদন সহজতর হয়।

মান্দায় ও শিবালয় উপজেলায় কৃষিবন্ধুচুলার ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ চুলায় রান্না, পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি উত্পাদিত বায়োচার জমিতে ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা হচ্ছে। কৃষি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমিতে এক বার বায়োচার ব্যবহার করলে শত শত বছর এর কার্যকারিতা থাকে তাই কার্বন সমৃদ্ধ বায়োচার বা কার্বন সমৃদ্ধ জৈব সার ব্যবহারে কৃষকের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি জমির স্থায়ী উর্বরতা এবং ফলনও বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের মান্দা ও শিবালয় উপজেলায় প্রায় ১২ শতাধিক কৃষক ফুলকপি, বাঁধাকপি, সরিষা, গম, ধান, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ভুট্টাসহ নানা ফসলি জমিতে কার্বনসমৃদ্ধ বায়োচার বা কার্বনসমৃদ্ধ জৈব সার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এভাবে যদি সারা বাংলাদেশে বায়োচার জৈব সার প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় তাহলে কৃষিতে উন্নতির সূবাতাস বইবে। প্রকল্পটি আইসিসিও এবং কার্ক ইন এক্টাই-এর সহায়তায় সিসিডিবি মাঠ পর্যায়ে ডিএইকে সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়ন করছে। কৃষিবিদরা বলছেন, বায়োচার একবার জমিতে দিলে তা শত শত বছর পর্যন্ত মাটিতে উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম, ফলে বাড়ে মাটির উর্বরতা। তাই রান্নার পাশাপাশি জমির গুণাগুণ ধরে রাখতে বায়োচার ব্যবহরের আহ্বান জানালেন কৃষি কর্মকর্তারা।

নওগাঁ জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মামছুল ওয়াদুদ বলেন, অধিক হারে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির জৈব পদার্থ কার্বন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ক্রমশ হ্রাস পাওয়া মাটিতে পরপর ‘কার্বনসমৃদ্ধ জৈব সার ব্যবহারে কার্বন বৃদ্ধি পাবে। এটির ব্যবহারে মাটিতে স্থায়িত্বশীল স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। ফলে কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করেও কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভ করবে বলেও মতপ্রকাশ করেন তিনি। ইতিমধ্যে নওগাঁর উপপরিচালক মো. শামছুল ওয়াদুদ এবং মানিকগঞ্জের উপপরিচালক মো. শাজাহান আলী বিশ্বাস প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।  মান্দা ও শিবালয় উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোছা. শায়লা শারমিন এবং রিয়াজুর রহমান বলেন, জমিতে আমাদের ৫ শতাংশ পর্যন্ত জৈব পদার্থ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে আমাদের কিন্তু অনেক কম পরিমাণ মাটিতে জৈব পদার্থ আছে। সেক্ষেত্রে যদি আমরা কৃষিবন্ধুচুলায় উত্পাদিত বায়োচার বা কার্বনসমৃদ্ধ জৈব সার ব্যবহার করতে পারি, এতে উপজেলাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য উপজেলায় কৃষকরা আশাকরি উপকৃত হবে।  কৃষিবন্ধুচুলায় কাঠ বা গোবর ও বিভিন্ন ধরনের বায়োমাস বা কৃষি অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে বায়োচার পাওয়া যায়, যা কার্বনসমৃদ্ধ। এই কার্বনসমৃদ্ধ বায়োচার জমিতে ব্যবহারে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং খরাপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চাষাবাদ করা যায়। বায়োচার জমিতে ভারী ও বিষাক্ত ধাতুকে (হেভি মেটালকে) নিষ্ক্রিয় করে রাখে ফলে উদ্ভিদের শিকড়ের সাহায্যে তা ফসল পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে পাওয়া যায় নিরাপদ ও বিষাক্ত ধাতুমুক্ত ফসল। এই চুলায় ৩৫-৪০ শতাংশ জ্বালানি কম লাগে তাই বনজসম্পদ রক্ষা পায় ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে, খাদ্য নিরাপত্তায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা।   

n লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ,  সিসিডিবি