রিফাত মুনীর ইতি
এক বছরেরও বেশি সময় পরে, সরকার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার, আর একে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকেই, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা। করোনা মহামারির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষা কার্যক্রমে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী আমাদের সন্তানরা। যদিও ডিজিটাল বাংলাদেশে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল, আমাদের সন্তানেরা প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও, পুরো বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীকে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তার সঙ্গে ছিল শিক্ষার্থীদের অনীহা। মূলত দীর্ঘদিনের এই বিরতি ওদের মাঝে পাঠ্যবইয়ের প্রতি অনীহা তৈরি করেছে, তারা যতটা ব্যস্ত নানা ধরনের সোশ্যাল সাইটে, ততটা নয় নিজের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতিতে। ফলে আমরা পাইনি পুরোপুরি কাঙ্ক্ষিত ফল।
বৈশ্বিক এই মহামারি অন্য সব জাতির মতো আমাদেরও ফেলে দিয়েছে মহা সংকটে। কোভিড-যুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের এই দেশটি নেমেছিল ঢাল-তলোয়ার বিহীনভাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু যে আমাদের লোকবল কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল তা নয়, আমরা ভাইরাস মোকাবিলার প্রাথমিক শক্তিও সঞ্চয় করতে পারিনি অনেক ক্ষেত্রে।
দিন পালটে গেছে। আজ শুধু ভ্যাক্সিন গ্রহণকারীর সংখ্যাই বাড়ছে না, বেড়ে গেছে কোভিড সচেতনতা। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কোভিড ভ্যাক্সিন অবিলম্বে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পদানের যে উদ্যোগ নিয়েছে, নিঃসন্দেহে তা বাস্তবসম্মত, প্রশংসনীয়। এমনি পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত একটা বড় চ্যালেঞ্জ, শুধু সরকার নয়, অন্য সবার জন্য। হাত ধোয়ার অভ্যাস করার বিষয়টি যত সহজ মনে হচ্ছে, আদতে ততটা নয়। অন্য সব জায়গার মতো এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত সবাই—ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকসহ বিদ্যালয়ে কর্মরত অন্যরা। আবার বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর জন্য করোনা পূর্ববর্তী স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি কেমন ছিল, সেটা ভাবতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই রাজধানী শহরেই অধিকাংশ সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বিদ্যালয়ের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। নিরাপদ পানীয়জলের অভাব, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের যথাযথ নিয়োগ ও কাজের আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতার অভাব এখানে নিত্য সঙ্গী। বলতে দ্বিধা নেই, নিজ নিজ ক্লাসরুম ও তার চারপাশের পরিষ্কার রাখতে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও শিক্ষক, অভিভাবক শ্রেণির ঘাটতি আছে। আমরা মুখে যতটা বলি কোনো কাজই ছোট নয়, বাস্তবে তা বিশ্বাস করতে পারি না। তাই এখন শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে আমরা কতটা আন্তরিক, সেটা ভাবতে হবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বৈশ্বিক সংকটে আমাদের করণীয় কী? অবশ্যই শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগেই নিশ্চিত করতে হবে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা। শুধু বিদ্যালয়ের চারপাশ পরিষ্কার করা নয়, তাদের উন্নত স্যানিটাইজেশন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আর এগুলোর নিয়ত পর্যবেক্ষণ, পরবর্তী সময়ে শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি সহপাঠীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত করা, শিক্ষার্থীদের কাজে উত্সাহ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনে বিশেষ স্বীকৃতি প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রম নির্দ্বিধায় তাদের কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দেবে।
আজকের শিক্ষার্থীদের সুস্থ থেকে কোভিড মোকাবিলায় সাহস, সততা ও আন্তরিকতার পরীক্ষা দিতে হবে। আমাদের সদিচ্ছা ও কঠোর একাগ্রতাই পারে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করতে।
ঢাকা