স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অগ্নিঝরা মার্চ

স্বাধিকার থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা

বাঙালিরা যখন এটা বুঝতে পেরে আন্দোলনে যুক্ত হলো এবং নির্বাচনে বিজয়ী হলো তখন পাকিস্তানিদের শোষণের ভিত নড়ে উঠল এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করল তারা। এক পর্যায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বাংলাদেশের নাগরিকদের নিধনের জন্য ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে চূড়ান্ত নিধন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, আর ২৫শে মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং গ্রেফতার হন। ২৬শে মার্চ বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের রূপ লাভ করে। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে ৩০ লাখ প্রাণের এবং ২ লাখ নারীর সম্মানের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

ইতিহাসের এত বড় একটা নিষ্ঠুর জেনোসাইডের জন্য পাকিস্তান বিশ্ববিবেক তো দূরের কথা, বাংলাদেশের কাছেও কখনো ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। বিশ্বের কোনো আদালত এত বড় একটা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করেনি। পাকিস্তান এখন পর্যন্ত এত বড় একটা ধ্বংসযজ্ঞকে কোনো না কোনোভাবে সঠিক ভাবার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো সুযোগসন্ধানী ঘোষণার ফসল নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতির আহ্বান ছিল। ছিল অনুসরণীয় কৌশল এবং করণীয় নির্দেশনা এবং স্পষ্ট ঘোষণা—যার উত্স বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। ৭ই মার্চের ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল এবং এই স্বাধীনতার ঘোষণা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন সার্বভৌম ব্যক্তিত্বের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্নতার সুর ছিল না। জনযুদ্ধের প্রস্তুতির আহ্বান ছিল কিন্তু জনযুদ্ধে আগাম ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশনা ছিল না। বাঙালি বাংলাদেশের স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনের সব সময় সাংবিধানিক নিষ্পত্তি চেয়েছে।

কিন্তু বাধ্য হয়েই বাঙালি তাদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোঠী ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জনযুদ্ধের ভিত্তি ছিল বাঙালির বাঁচা-মরার লড়াই, কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। ফলে বিশ্বজনমত পাকিস্তানের সশস্ত্র বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের আপামর জনতার সশস্ত্র সংগ্রামে অফুরন্ত সমর্থন জানায় এবং সহায়তায় এগিয়ে আসে। এগিয়ে আসে ভারতীয় মিত্রবাহিনী, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবতার স্বার্থে বাংলাদেশের সশস্ত্র সংগ্রামে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে। বিশ্ববিবেকের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আগ্রাসন নয় বরং ন্যায্যতা পায়।

লেখক: প্রো-ভিসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি