লোহার পাতে স্বপ্ন চাপা

বেলা দ্বিপ্রহর। মাথার ওপর কিরণ দিচ্ছে সূর্য। আশপাশে লোহার পাতের ছড়াছড়ি। কেউ পুরান পাত ঢাউস হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে সমান করছে। তাকে সহায়তা করছে আরো কয়েক জন। কেউ অসংখ্য লোহার পাত একে একে ঝালাই দিয়ে গড়ে তুলছেন বিরাটকায় জাহাজ। কেউ বা করছে অন্য কাজ। সবাই মেতে আছে বিশাল কর্মযজ্ঞে। উদ্দেশ্য ছোট ছোট লোহার পাত জোড়া লাগিয়ে দুইতলা, তিনতলা-চাই কি চারতলা বিশিষ্ট বিশাল আকারের জাহাজ তৈরি। কারো দম ফেলার ফুরসত্ নেই। তারই মধ্যে একটু সময় চেয়ে নিয়ে কথা হয় কয়েক জনের সঙ্গে। বলছিলাম পুরান ঢাকার সদরঘাট সোজাসুজি বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত কেরানীগঞ্জের একটি ডকইয়ার্ডের কর্ম পরিবেশের কথা। সেখানকার শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার কথা। তাদের দুঃখ-বেদনার কথা। হাসি-আনন্দের কথা।

কেরানীগঞ্জের এ অংশে ৮০টি ডকইয়ার্ডে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তৈরি হয় বিলাশ বহুল সব লঞ্চ। কোন মালিক কোন রকম একটি লঞ্চ পানিতে ভাসাতে পারলে তার আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় না। এক থেকে দুই। দুই থেকে চার। কিংবা তার বেশি জাহাজের মালিক বনে যান তারা। কিন্তু যারা শক্ত লোহার পাতকে পিটিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লঞ্চ বা জাহাজের আকার দেন, কখনো কখনো দুর্ঘটনায় যায় জীবন-সেই শ্রমিকদের ভাগ্য ‘দিন আনে, দিন খায়’ নিয়মে বাধা। তাদের স্বপ্ন সাধ যেন লোহার পাতে চাপা।

নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানার বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা (৪৭)। তিনি জানান, বাবা-মার চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ। বাবা ছিলেন কৃষক। মোস্তফার ছেলে বেলার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শিখে হবেন মস্তবড় অফিসার। লেখাপড়া করেছিলেনও পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত। তার পর আর হালে পানি পায়নি। একেতো বাবা-মা ও ভাই-বোনসহ ৯ সদস্যের পরিবার। তার ওপর অনাবৃষ্টি অতিবৃষ্টি, বন্যা-ঝড় জলোচ্ছ্বাস এমন নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এক বছর ফসলে গোলা ভরেতো অন্য বছর ফসলহানি। কৃষি পরিবারে নিত্য নতুন টানাপড়েন। অভাব অনটনে সংসার আর চলে না। একবেলা ভাত জোটেতো আরেক বেলা কাটে অনাহারে, অর্ধাহারে। তেমনি বিষণ্ন পরিবেশে একদিন বাড়ি ছাড়েন ভাগ্যের চাকা ঘুরানোর আশায়। কৈশোর বয়সেই কাজে নেমে পড়েন ডকইয়ার্ডে। কাজ ফুট-ফরমায়েস খাটা। বয়স্ক মিস্ত্রি ও তাদের সহায়তাকারীদের চাহিদামতো এটা সেটা এগিয়ে যুগিয়ে দেওয়া। কাকডাকা ভোরে কাজ শুরু। শেষ অন্ধকার নেমে আসা সন্ধ্যা নাগাদ। তারই মধ্যে খাওয়া। অন্যসব কাজ। প্রতিদিন মজুরি ১০০ টাকা। তার পর একে একে কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজের পাহাড় ঠেলে এখন তিনি জাহাজ তৈরির ডিজাইনার বা নকশাকার। এ ব্যাপারে তার নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। কেবল দেখে দেখে শেখা। দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে এখন তার দৈনিক মজুরি ৯৫০ টাকা।

একই সঙ্গে কাজ করেন রবিশাল জেলার মেহিন্দীগঞ্জের আবুল কাশেম (৬০), মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী থানার সোহাগ (২৫) এবং আরো অনেকে। এলাকার ৮০টি ডকইয়ার্ডে এমন প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। যাদের মধ্যে দৈনিক মজুরি ১৫০ টাকা থেকে কাজের ধরন বুঝে ১০০০ টাকা পর্যন্ত।

শ্রমিকরা জানান, তারা দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত কাজ করেও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেননি। কোনো শ্রমিক আহত হলে বা পরিবারের কোনো সদস্যের চিকিত্সার প্রয়োজন হলে ডকইয়ার্ড মালিকদের আর্থিক সহায়তা মেলে না। তবে কর্মরত অবস্থায় কোনো শ্রমিক বিদ্যুত্স্পৃষ্টে বা লোহার পাতে চাপা পড়ে নিহত হলে ভুক্তভোগী পরিবারকে ১ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেন ডকইয়ার্ড মালিকরা। তাছাড়া ঈদ বা অন্য কোনো উত্সবে মেলে ন্যূনতম আর্থিক সহায়তা। তাই এ ব্যাপারে সরকার ঘোষিত মজুরি কাঠামোর আওতায় পারিশ্রমিকসহ জীবন বীমা, ঝুঁকিভাতা ও চিকিত্সা ভাতার দাবি জানান তারা।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি