প্রযুক্তি যখন হাতের কাছে তখন মানুষ ছয় ইঞ্চি পর্দার ভেতরেই নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। গ্রামের কিশোররা এখন পাবজি-ফ্রি ফায়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আপনি যখন একটু বের হবেন গ্রামের হাওয়া-বাতাস গায়ে লাগাতে তখন দেখতে পাবেন পাড়ার দোকানের বাঁশের মাচায়, গাছের ছায়ায় অথবা রাস্তার ধারে এক দল কিশোর বসে মনোযোগ দিয়ে স্মার্ট ফোনের পর্দায় তাকিয়ে আছে। কখনো বা শুনবেন হিন্দিতে গালিগালাজ করছে, আবার কখনো বা বাংলায়। হিংস্রাত্মক শব্দের ব্যবহার তো থাকবেই। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে কোনো কিশোর গ্যাং মারামারি করছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝে যাবেন আসল ঘটনা।
এসব কিশোরদের বেশির ভাগই হাইস্কুল পড়া অবস্থা। প্রাইমারিতে পড়া বাচ্চা আর নবম শ্রেণিতে পড়া কিশোরদের এখন তথাকথিত অনলাইন গেমে আসক্তি বেশি। শুধু গেম খেলছে তা নয়, এই গেমের ভেতরে থাকা নানা বিষয়বস্তু কেনার পেছনে ঢালছে টাকাও। সেই টাকার অংকটা বেশ ভারী তাদের বয়সের তুলনায়। সাধারণত এ ধরনের বয়সের কিশোররা উপার্জন করে না আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু তারা বিশাল অংকের একটা টাকা ব্যয় করছে এর পেছনে।
গেম আসক্তি বা অনলাইন আসক্তিতে জড়িত কিশোর ও তরুণদের মধ্যে গবেষণা ও জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে ৪.৬ শতাংশ কিশোর ও তরুণ অনলাইন গেমিং আসক্তিতে ভুগছে। এদের মধ্যে আবার ৬.৮ শতাংশ কিশোর এবং ১.৩ শতাংশ কিশোরী (জে ওয়াই ফ্যাম, ২০১৮)। বিশ্ব জুড়ে প্রকাশিত ১৬টি গবেষণাপত্র অ্যানালাইসিস করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
অনলাইন গেম আসক্তি নতুন নয়। বিপুল হারে বাড়ছে এর পরিমাণ। এর ফলে আবার কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধেও। গেমের পেছনে ব্যয় করা টাকার সিংহভাগই আসে প্রাইভেট কোচিংয়ের নাম করে নেওয়া টাকার অংশ থেকে। অভিভাবকরা তাহলে কেন এসব ব্যাপারে সচেতন হচ্ছেন না?
বিটিআরসির তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০১৯-এর এপ্রিলে ৯ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ ইন্টারনেটের গ্রাহক। এদের মধ্যে স্মার্ট ফোন ইউজার ৮ কোটি ৭৯ লাখ। ২০১৬ সালের তথ্য মতে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৩৫ শতাংশ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এদের মধ্যেই গেমিং আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি সব থেকে বেশি। স্মার্ট ফোন বা গেম আসক্তির নেতিবাচক দিকটাই বেশি। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় থাকতে থাকতে এদের অনেকেই বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এখন এই আসক্তি ক্ষতিকর হারেই বেড়ে চলেছে। এখন কিশোররা মাঠে খেলতে যায় না। সময় পেলেই স্মার্ট ফোন হাতে বসে যায়। স্মার্ট ফোনের দামটাও হাতের নাগালে চলে এসেছে। ডাটা প্যাকের দাম বাড়ার পরেও অনলাইন গেম আসক্তি কমেনি। এ সমস্ত খরচ যোগাতে অভিভাবকদের ভালো লাগার কথা নয় নিশ্চয়ই। এখন এর বিকল্প কি ভাবছেন অভিভাবকরা? অনেকের কাছে মনে হয় বাইরের ছেলেপেলের সঙ্গে মিশে নিজের সন্তান খারাপ হতে পারে। এর থেকে একা একা গেম খেলা নিশ্চয়ই খারাপ কিছু না। কিন্তু একা থাকা এখনকার প্রজন্মের জন্য বেশি নেতিবাচক নয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন গেম আসক্তি অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্যের আসক্তির মতোই। পার্থক্য এটুকুই একটা আচরণগত আসক্তি আরেকটা রাসায়নিক আসক্তি। রিওয়ার্ড সেন্টার নামে মস্তিষ্কের যে অংশে নেশাজাত দ্রব্যের আসক্তি জন্ম নেয় সেই অংশেই ইন্টারনেট বা অনলাইন আসক্তি জন্মায়। তাই অনলাইন গেম আসক্তিকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
অনলাইন গেম আসক্তি এখন মানসিক রোগের পর্যায়ে চলে গেছে যেটা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে গেমিং ডিজ অর্ডার নামে পরিচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দীর্ঘদিনের জরিপ আর গবেষণার মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজের ১১তম সংশোধিত সংস্করণ (আইসিডি-১১) একে মনোস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ২০১৮ সালের জুন মাসে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে প্রকাশিতব্য আইসিডি-১১ শীর্ষক রোগ নির্ণয়ে গাইডবুকে এই সমস্যাটি সংযুক্ত করা হয়েছে।
গেমিং নিয়ে বেশ কয়টি দেশে নানা রকম আইন প্রচলিত রয়েছে। ১৬ বছরের কম বয়সি শিশুরা যাতে মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত গেম খেলতে না পারে সেই ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়াতে আইন রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গেম খেললে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় জাপানে। চীনের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট শিশুদের জন্য গেম খেলার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে নেই তেমন কোনো উদ্যোগ। কিছুদিন আগে ভারতে পাবজি-ফ্রি ফায়ারের সার্ভার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার চাইলে এক্ষেত্রে সেজাতীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যত্ সুন্দর করার লক্ষ্যে। করোনা মহামারির চেয়ে ভয়াবহ শিশু-কিশোরদের অনলাইন গেম আসক্তি। এই মহামারি থেকে যত দ্রুত সম্ভব শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়