‘পাঁচ বখাটে পরিকল্পিতভাবে আমার মেয়েকে হত্যা করেছে। এই পাঁচ জনকে আসামি করে কলাবাগান থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পুলিশ কাউকে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করতে পারেনি। পুলিশ এখনো বলছে, আমরা তদন্ত করছি। এখনো কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’ গতকাল এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর কলাবাগান থানা এলাকায় ছাদ থেকে পড়ে নিহত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাজরিয়ান মোস্তফা মৌমিতার বাবা ও মামলার বাদী কামাল মোস্তফা খান ওরফে শামীম।
তবে বাদীর অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে মামলার তদারক কর্মকর্তা কলাবাগান থানার ওসি পরিতোষ চন্দ্র ইত্তেফাককে বলেন, এই মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি আমীর হামজা আদনানকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ চলছে। মৃতের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এখনো পাইনি। মৃত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কি না—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়েছি। মৃতের ভিসেরা রিপোর্ট পেলে এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। সিআইডির ক্রাইম সিন ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে। রিমান্ডে আদনান এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, তদন্তকালীন অবস্থায় কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে এ ঘটনা তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকালে কলাবাগান ৮ নম্বর রোডের ২ নম্বর বাসার সাত তলার ছাদে বি/৩ নম্বর ফ্ল্যাটের মালয়েশিয়ার এশিয়ান প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (আইটি)-এর ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী তাজরিয়ান মোস্তফা মৌমিতা (১৯) ঘুরতে যান। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মৌমিতাকে ঐ ভবনের নিচ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় গত ১ মার্চ মৌমিতার বাবা কলাবাগান থানায় পাঁচ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
মামলায় বাদীর অভিযোগ : মামলার বাদী কামাল মোস্তফা খান ওরফে শামীম এজাহারে বলেছেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টা ২০ মিনিট থেকে ৬টার মধ্যে আসামিরা পূর্বপরিকল্পিত তার মেয়ে তাজরিয়ান মোস্তফা মৌমিতাকে বাসার ছাদের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। ঐ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ফারযাদ আহমেদ ওরফে ফাইজার, আদনান, তানভীর, ত্রিনয়, অপরাজিতাসহ আরো অজ্ঞাতনামাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা থাকতে পারে।
এজাহারে আরো বলা হয়, মেয়ের মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের সময় বাদী জানতে পারেন যে, একই ভবনের বি-৫ ফ্ল্যাটের মালিক অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনের ছেলে ফারযাদ আহমেদ ওরফে ফাইজার ও তার বন্ধু আদনান, তানভীর, ত্রিনয়, ফাইজারের বান্ধবী অপরাজিতাসহ ফাইজারের আরো কিছু অজ্ঞাতনামা বন্ধু ফাইজারের নেতৃত্বে নিয়মিত ছাদে আড্ডা দিত। তারা ক্রিকেট খেলত এবং উচ্ছৃঙ্খলভাবে সময় কাটাত। করোনার কারণে মৌমিতা একটানা বাসার ভেতরে থাকাতে একঘেয়েমি কাটানোর জন্য মাঝে মধ্যে ছাদে যেত। সেই সুযোগে ফাইজার ও তার বন্ধু আদনানের সঙ্গে তার মেয়ের পরিচয় হয়। তার মেয়ে ছাদে গেলেই তারা বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করত। ঘটনার আগের সপ্তাহে মৌমিতা এ ব্যাপারে তার মায়ের কাছে অভিযোগও করে। এর সূত্র ধরে তার স্ত্রী ফাইজারের মাকে জানায়। এতে ফাইজারের মা তার স্ত্রীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। সে কারণে ফাইজার ও তার বন্ধুরা উত্তেজিত হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়, ঘটনার দিন বিকাল ৫টা ১৬ মিনিট থেকে ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত তার ছোট মেয়ে অনিকা মোস্তফা মেজো মেয়ে মৌমিতার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছিল। এর আগে বিকাল পৌনে ৫টার দিকে মৌমিতাকে ডাকার জন্য তার বাসার কাজের ছেলে মুজাহিদকে ছাদে পাঠান। মুজাহিদ ফিরে এসে তাকে জানায় যে ছাদের দরজা ভেতর থেকে আটকানো। তবে দরজার ভেতরে অর্থাত্ ছাদে তার মেয়ে মৌমিতাসহ আরো অনেকের হৈচৈ এবং খেলাধুলা করার শব্দ পেয়েছিল।