নতুন টার্মিনাল ও জেটি নির্মাণসহ চট্টগ্রাম বন্দরকে সম্প্রসারণে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা। কারণ ২০০৭ সালের পর এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কোনো নতুন জেটি বা টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়নি। তবে নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীরে ইতিমধ্যে শুরু হওয়া পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পথে। পিসিটির মাধ্যমে সাময়িক উত্তরণ সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে বে-টার্মিনাল নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
প্রায় সাত বছর আগে বে-টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে এর খুব বেশি অগ্রগতি নেই। কারণ এখনো জমি অধিগ্রহণের পরিপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়নি। তাছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা আমদানি পণ্যের জন্য বে-টার্মিনাল এলাকায় ডেলিভেরি ইয়ার্ড নির্মাণে গত কয়েক বছরের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। এখনো মাটি ভরাটসহ কোনো অবকাঠামোও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
অপরদিকে, বে-টার্মিনাল নির্মাণে পিপিপি পদ্ধতি অনুসরণ করার যে সরকারি সিদ্ধান্ত তাও বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্যণীয়। ইতিমধ্যে বে-টার্মিনাল নির্মাণে কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। আবার ভারত সরকার একটি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দেরও ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কোনো প্রস্তাবই পরিপূর্ণতা পায়নি। ফলে পিপিপি নিয়ে একপ্রকার অচলাবস্থা বা ধীরগতি লক্ষণীয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সম্প্রতি সরকারের এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তার নিজস্ব অর্থায়নে বে-টার্মিনালের একাধিক টার্মিনালের মধ্যে একটি টার্মিনাল নির্মাণ নিজেরাই প্রথমে শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর তার নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামোসহ পুরো একটি টার্মিনালের কয়েকটি জেটি নির্মাণের কথা জানিয়েছে।
গত ২০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের উপদেষ্টা কমিটির ১৪তম সভায় ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বে-টার্মিনালের অন্তত একটি টার্মিনাল নিজস্ব অর্থায়নে করা যায় কি না বিবেচনার জন্য বলেছেন। তিনি বে-টার্মিনালকে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকায় নিয়ে আসার ব্যাপারে প্রস্তাব দেন।
বিশেষ করে পতেঙ্গাসংলগ্ন সমুদ্র উপকূলে বে-টার্মিনাল নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্রেকওয়াটার সিস্টেম অনুসরণ করতে হবে। যাতে করে সমুদ্রের ঢেউ সরাসরি জেটিতে আঘাত করতে না পারে। নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রেও ব্রেকওয়াটার পদ্ধতি অনুসরণ করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, তুলনামূলক কম অর্থে এবং বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে একটি টার্মিনালসহ এর নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্রেকওয়াটার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ স্বল্প সময়ের মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ করতে সক্ষম। একটি টার্মিনাল নির্মিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী টার্মিনালগুলো নির্মাণে নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্টরা জানান, বে-টার্মিনাল নির্মাণ, এর অপারেশন কোনোভাবে বিদেশি সংস্থার অধীনে চলে গেলে তা চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা থেকে যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বে-টার্মিনাল নির্মাণকারী এবং অপারেশনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান আমদানি-রপ্তানির জাহাজ নির্দিষ্ট জেটিতে ভেড়ানোর ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব রাখবে। বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, বে-টার্মিনালে তিন-চারটি টার্মিনাল নির্মাণের যে পরিকল্পনা রয়েছে তা একটি নির্মাণের পর পরবর্তী টার্মিনালসমূহের নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার আলোকে তৈরি করার পথ উন্মোচিত হবে। কারণ, এখনই সবগুলো টার্মিনাল নির্মাণের জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে না। বে-টার্মিনালের পরিকল্পনার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, পুরো টার্মিনাল নির্মাণ হলে আগামী অর্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে দেশে আর বন্দর নির্মাণের প্রয়োজন পড়বে না। একদিকে বে-টার্মিনাল যেমন একটি বৃহদাকার আধুনিক পোর্ট নির্মাণ হবে। তেমন প্রায় ১৪/১৫ মিটার গভীরতার বড় আকারের জাহাজ ঐ টার্মিনালে ভিড়তে পারবে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বর্তমানে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য লাইটারেজ জাহাজযোগে জেটিতে আসার প্রয়োজন পড়বে না। এতে করে ব্যবসায়ীরা আর্থিক এবং সময়ের ক্ষেত্রে বিরাট সুবিধা পাবে। তাছাড়া বে-টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ ভিড়তে পারবে। এতে করে চট্টগ্রাম শহরে যানজট কিংবা ট্রাক, লরি, ট্রেলারের উপদ্রব কমে যাবে।