বিদায়ের স্মৃতি

 

কয়েক দিন ধরেই করোনা ভাইরাসের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার খবর পাচ্ছিলাম। বাজারে মাস্কের ঘাটতি দেখা যাচ্ছিল। আমি মেস থেকে ক্যাম্পাসে হেঁটে যাওয়ার সময় বাজারের দোকানগুলোতে ভালোভাবে লক্ষ করতাম, সত্যিই মাস্ক নেই। তারপর ১৭ তারিখ ক্লাস শেষে হঠাত্ জানতে পারলাম ক্যাম্পাস কিছুদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধু-বান্ধবীদের দেখলাম তারা নোটিস বোর্ড দেখছে সত্যিই ছুটি কি না। যা হোক, বিকালে ট্রেনের টিকিট কেটে ফেললাম। আমি আর জুনায়েদ একসঙ্গে যাব। জুনায়েদ রাজবাড়ী নেমে, রাজবাড়ী থেকে বাস ধরে ফরিদপুরে চলে যাবে।

সন্ধ্যার পর থেকে এক অন্যরকম রাজশাহীর সঙ্গে পরিচিত হলাম। সবাই চলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে তন্ময় এসে রুম গরম করে ফেলল, গিটারে গান ধরতে হবে। সবাই যখন বাসায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে তখন আমরা গিটার নিয়ে রুমে চিল্লাচিল্লি করছি। অনেকেই হয়তো আমাদের কারণে বিরক্ত হয়েছে সেই দিন। এরই মধ্যে আমার রুমমেট জুনায়েদ ভাই চলে যাওয়ার জন্য তৈরি। ভাইয়ের গিটার দিয়ে দিলাম আর কোলাকোলি করে বিদায় নিয়ে নিলাম। তন্ময় ওর মেসে চলে গেল। দেখতে দেখতে মেস খালি হয়ে গেল। এক অন্যরকম শূন্যতায় ঘিরে ফেলল চারপাশ।

ক্যাম্পাসের হলগুলোও সব খালি হয়ে গেছে। সবাই হল ছেড়ে রওনা দিয়েছে বাড়ির পথে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সারা ক্যাম্পাস আলোকসজ্জায় সজ্জিত অথচো তা দেখার কেউ নেই। রাত ১২টার দিকে আমি, টুডু আর রজব বের হলাম চা খাওয়ার জন্য। বিনোদপুরে রাত ১২টা/১টার সময় চা খাওয়ার জন্য বের হওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু ঐদিন বিনোদপুর অনেকটাই ফাঁকা ছিল। আমার মেসের মতো বিনোদপুরের চারপাশটাও ছিল নিস্তব্ধ, শূন্য। যদিও ছুটি ছিল অল্প কয়েক দিনের, কিন্তু মনে মনে ঠিকই জানতাম ক্যাম্পাস এত তাড়াতাড়ি খুলবে না। এরই মধ্যে মনে হলো—একবার ক্যাম্পাস থেকে ঘুরে আসা দরকার। তারপর তিন জন রিকশা করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে গেলাম ক্যাম্পাসে। ফাঁকা ক্যাম্পাসে গুটিকয়েক ছাত্রছাত্রীকে দেখতে পেলাম শুধু।

ভোর ৫টার দিকে টুডু আমার রুমের সামনে এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। ভোরে ওর বাস ছিল। দুজন কোলাকোলি করে বিদায় নিলাম। আমিও আমার জিনিসপত্র গুছিয়ে ৬.৩০ মিনিটের দিকে বের হয়ে পড়লাম। রাস্তায় রজবের মেসের সামনে রজবকে ফোন দিয়ে বললাম বন্ধু চলে যাচ্ছি। রজব ওর মেস থেকে নিচে এসে আমাকে বিদায় দিয়ে গেল। অল্প সময়ের মধ্যেই খুব কাছে চলে এসেছিল সবাই। কিন্তু সবকিছু দ্রুত ঘটে যাওয়ায় সেভাবে বিদায় নেওয়া হয়নি কারো কাছ থেকে।

চার বছর পর গ্র্যাজুয়েশন শেষ হলে এভাবেই হয়তো আরো এক বার বিদায় নিতে হবে সবার কাছ থেকে। অনেক বছর পর হয়তো কারো সঙ্গে দেখা হবে, আর কেউ কেউ হারিয়ে যাবে চিরতরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপে প্রায়শই দেখি প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা তাদের ছাত্রজীবনের কথা মনে করে স্মৃতিকাতরতাই ভোগেন। তখন আমার মনে হয়, আমরাও একদিন এরকম স্মৃতি কাতরতায় ভুগব প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে করে।