দেশের নারীদের বড় একটা অংশ এখনো প্যাড ব্যবহার করেন না। মূলত, বেশি দাম ও সচেতনতার অভাবে প্রায় ৮০ ভাগ নারীই মাসিকের (পিরিয়ড) সময় প্যাড ব্যবহার করেন না। এতে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন তারা। তার পরও বেড়েছে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার। সচেতনতা বাড়ছে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে।
প্রতিবছর বাড়ছে স্যানিটারি ন্যাপকিনের (প্যাড) বাজার। ২০০৮ সালে যেখানে প্যাডের বাজার ছিল মাত্র ২৫ কোটি টাকা, এক যুগে তা ৩৫০ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। স্যানিটারি ন্যাপকিন উত্পাদকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে অনিয়মিত ব্যবহারকারীসহ মোট ১৪ শতাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতেন। এখন ব্যবহার করেন ২০ শতাংশ। এ বিষয়ে এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আলমগীর বলেন, প্রতিনিয়ত দেশে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বাজার বড় হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিবেচনায় দেশে এ খাতের বাজার এখন ৩৫০ কোটি টাকার। বর্তমানে স্কয়ারের সেনেরা ব্র্যান্ডের মার্কেট শেয়ার সবচেয়ে বেশি। দেশের ৪২ ভাগ বাজার সেনোরার দখলে। এছাড়া এসএমসির জয়া ২৭ ভাগ, এসিআইয়ের ফ্রিডম ২১ ভাগ এবং বাকিটা অন্যান্য ব্র্যান্ডের দখলে রয়েছে।
প্যাড ব্যবহারকারীরা বলছেন, প্রতি মাসেই এজন্য বড় একটা বাজেট রাখতে হয়। যে সব পরিবারে নারী বেশি তাদের খরচও বেশি। জান্নাতুল ফেরদৌস ঢাকায় বসবাস করেন। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারে চার জন নারী। তাই প্যাড কেনার জন্য প্রতি মাসেই বেশ খরচ করতে হয়। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)। এ বিষয়ে সফলতা পাওয়া বেসরকারি এ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির বলেন, প্যাড ব্যবহার বিষয়ে আমাদের দেশের মানুষ এখনো সচেতন নয়। অনেকে এটাকে অতিরিক্ত খরচ ভাবেন। তবে এতে স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটি তারা বোঝেন না। এ ছাড়া, স্বল্পমূল্যে প্যাড তৈরিতে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। দাম ও উত্পাদনের কাঁচামালের সহজলভ্যতার বিবেচনায় স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি প্যাড তৈরি ও সরবরাহ করছে ‘ইলা প্যাড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ইলা প্যাডের প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রহমান বলেন, বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ হলেও মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না। এটা একটা সামাজিক ট্যাবু। এ ছাড়া, নারীরা এখনো দোকান থেকে স্যানিটারি প্যাড কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আবার কিনলেও সেটাকে প্যাকেট করে দিতে বলেন। যাতে তিনি কী নিয়ে যাচ্ছেন, তা যাতে কেউ বুঝতে না পারে। নারীরা যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে, এ লক্ষ্যে ব্যাপকহারে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। আর সরকার যদি স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভর্তুকি দেয়, তাহলে প্যাড ব্যবহারকারীর সংখ্যা আরো বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। পুনঃব্যবহারযোগ্য এ প্যাডের জন্য এখন এক জন ব্যবহারকারীকে ৪০ থেকে ৫০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সরকারি সহায়তা পেলে বছরে তা ২০ থেকে ৩০ টাকায় নেমে আসবে। গার্মেন্টসের ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি হওয়ায় এ প্যাড পরিবেশবান্ধব।
গত বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভে-২০১৮ প্রকাশ করে। জরিপে দেখা গেছে, মাসিকের সময় শহরের নারীরা প্যাড ব্যবহার করলেও গ্রামীণ নারীরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে।
দেশে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা করে থাকে নেদারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিমাভি। এ প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাহবুবা হক কুমকুম মহিলা অঙ্গনকে বলেন, বাংলাদেশের নারীরা কয়েকটি কারণে এখনো পর্যন্ত স্যানিটারি ন্যাপকিন (প্যাড) ব্যবহার করে না। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাম। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে পাওয়া না যাওয়াও একটি কারণ। ব্যবহারবিধি না জানা এবং দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেয়েরা মাসিককালীন সময়ে প্যাড ব্যবহার করেন না। ছবি: ইন্টারনেট