ফসলি জমি রক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন

বাংলাদেশের এখনো তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সরাসরি কৃষি অর্থনীতির সহিত জড়িত। তাহাদের জীবন-জীবিকা কৃষি উত্পাদন ও কৃষি বিপণন প্রক্রিয়ার সহিত সম্পৃক্ত; কিন্তু জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত আবাসন, শিল্পায়ন, নগরায়ণ প্রভৃতি কারণে ক্রমেই হ্রাস পাইতেছে ফসলি তথা কৃষিজমির পরিমাণ। সেই সকল জমিতে নির্মাণ করা হইতেছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, হাটবাজারসহ বিভিন্ন প্রকার স্থাপনা। ইটভাটা, পুকুর-দিঘি খনন, মত্স্য চাষ, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের ফলেও ক্রমাগত বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি হারাইয়া যাইতেছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন ২ হাজার বিঘা জমি কৃষি হইতে অকৃষি খাতে চলিয়া যাইতেছে। এই পরিস্থিতি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ; কিন্তু এই ব্যাপারে আমাদের মাথাব্যথা আছে বলিয়া মনে হয় না। গতকাল ইত্তেফাকের একটি খবরে বলা হইয়াছে, কক্সবাজার সদরের বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী উত্তর মুহুরীপাড়ার তিন ফসলি প্রায় ৬০ একর উর্বর জমি ভরাট করিয়া ফেলিতেছে। ইহা পলি দো-আঁশবেষ্টিত অতি উর্বর ভূমি। এই সকল জমিতে আমন ও বোরো মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার মণ ধান উত্পাদিত হয়। অথচ এই জমি আবাসন প্রকল্পের জন্য জোরপূর্বক ভরাট করিবার অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। ভুক্তভোগী ও অসহায় জমির মালিকগণ জেলা প্রশাসক, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করিয়াও কোনো প্রতিকার পাইতেছেন না। একদিকে কৃষিজমি ভরাট অন্যদিকে ভূমিদস্যু কর্তৃক জোরপূর্বক কৃষিজমি দখল—এই দুই অনিয়মের সুরাহা হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

শুধু কক্সবাজার নহে, সমগ্র দেশেই কৃষিজমি হ্রাসের প্রবণতা লক্ষণীয়। দেশে যেই হারে কৃষিজমি বেহাত হইতেছে তাহা এক কথায় উদ্বেগজনক। ইহা কৃষি অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ-স্বরূপ। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন হেক্টর। ইহার প্রায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ জুড়িয়া রহিয়াছে বনভূমি। ২০ দশমিক ১ শতাংশ স্থায়ী জলাধার, ঘরবাড়ি, শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি এবং অবশিষ্ট ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ জমি ব্যবহূত হয় কৃষিকাজের জন্য। বর্তমানে উন্নত কৃষিপ্রযুক্তি ও আধুনিক চাষাবাদের কারণে খাদ্য উত্পাদন পূর্বের তুলনায় বাড়িয়াছে। দেশে এখন খাদ্যসংকট নাই বলিলেই চলে; কিন্তু এই অবস্থা দীর্ঘদিন বজায় থাকিবে—এমনটি ভাবিবার অবকাশ নাই। জাতিসংঘের সহায়তায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান (এসআরডিআই) পরিচালিত এক গবেষণা মতে, ১৯৭৬ হইতে ২০০০ সাল পর্যন্ত শূন্য দশমিক ১৩৭ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমিলেও ২০০০ হইতে ২০১০ সাল মেয়াদে এই হারের পাঁচ গুণের অধিক শূন্য দশমিক ৭২৮ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমিয়াছে। বর্তমানে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় গত এক দশকে কৃষিজমি হ্রাস পাইবার প্রবণতা আরো বাড়িয়াছে বইকি।

কৃষিজমি কমিয়া যাওয়ার পশ্চাতে অপরিকল্পিত আবাসনই হইল মূল সমস্যা। কারণ বেহাত হওয়া বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির ৮০ শতাংশই ব্যবহূত হইতেছে ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য। মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য আমাদের অবশ্যই বাড়িঘর নির্মাণ করিতে হইবে; কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও আজ বহুতল বাড়িঘর নির্মাণকে উত্সাহিত করা প্রয়োজন। এই জন্য প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। এই সংক্রান্ত যেই সকল প্রতিবন্ধকতা রহিয়াছে তাহাও দূর করা আবশ্যক। জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন অনুযায়ী কৃষিজমি কৃষিকাজ ব্যতীত অন্য কাজে ব্যবহার করা যাইবে না; কিন্তু কেহ এই আইন মানিতেছেন বলিয়া মনে হয় না। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দাপট কমিয়া গিয়া শিল্প ও সেবা খাতে আমাদের অর্থনীতি নূতন ঠিকানা খুঁজিতেছে; কিন্তু দেশের খাদ্যচাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিজমির ব্যবস্থা না করিয়া শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতি টিকসই হইতে পারে না। তদুপরি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ঝুঁকি তো আছেই। অতএব, আমাদের কৃষিজমি রক্ষায় তদারকি বৃদ্ধি, আইনের বাস্তবায়নসহ সরকারিভাবে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে।