দেশে প্রায় দুই মাস করোনা সংক্রমণের হার নিম্নমুখী থাকার পর ফের বাড়তে শুরু করেছে সংক্রমণ। গত বুধবারে সংক্রমণের হার বেড়ে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে পৌঁছায়। যা বিগত দিনের চেয়ে ঊর্ধ্বমুখী। এর আগে জানুয়ারি মাসের ১৮ তারিখে সংক্রমণের হার কিছুটা বেশি দেখা যায়। বিগত করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, দেশে করোনা পরিস্থিতি শুরুর দিকে যেভাবে সংক্রমণ বেড়ে ছিল সেই তুলনায় গত দুই মাস করোনা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ছিল বলা চলে; কিন্তু হঠাত্ করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাবার পিছনে আমাদের দায় থেকে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় চরম অনীহা। আমরা বাইরের দেশের মতো করোনার অতিমাত্রার ভয়াবহতা দেখিনি। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা প্রতিরোধে বেশ সক্ষম হয়েছি; কিন্তু তার অর্থ এমনটি প্রকাশ করে না যে, করোনা পুরোপুরিভাবে দেশ থেকে নির্মূল হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তগুলো আমরাই লঙ্ঘন করছি। মাস্ক ব্যবহার যেখানে বাধ্যতামূলক বলা যায়, আমরা এখন অনেকেই মাস্কের ব্যবহার করি না। জনসমাগম এড়িয়ে চলা যেখানে প্রয়োজন সেইখানে আমরাই নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছি, লোক সমগম বৃদ্ধি করছি। এতে নিজে এবং অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
প্রায় দুই মাস আমরা একপ্রকার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি; কিন্তু সংক্রমণের হার এভাবে বাড়তে থাকলে আমাদের শান্তির জায়গাটা অনেকটা উদ্বেগের হবে। আমরা বাইরের দেশের করোনার বড় ধাক্কা দেখেছি। আমরা লকডাউন দেখেছি তবুও কেনো বারে বারে ভুল পথেই হাঁটছি! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ হয়ে আছে, যার ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষাব্যবস্থা। পরবর্তীকালে আবার লকডাউন হলে শুধু শিক্ষার্থী বা জনজীবন নয়, স্থবির হবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। আমাদের কোনো রকম বড়সড় ধাক্কা আসার আগেই আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের অনীহা দূর করে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। মুখে মাস্কের ব্যবহার আর সচেতনতা না বাড়ালে পরিস্থিতি অন্যদিকে রূপ নেবে, যা আমাদের জন্য মঙ্গলকর হবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে করোনার নতুন স্ট্রেইন বা ধরন দেখা গেছে বাংলাদেশে। এ নিয়ে বেশ শঙ্কায় আছে মানুষ। নতুন এই ধরন আগের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি শক্তিশালী এবং দ্রুত মানুষকে সংক্রমিত করে বলে জানা যায়। ব্রিটেনে এর প্রভাব সম্পর্কে আমরা জেনেছি। শুধু ব্রিটেনে নয়—ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ প্রায় ৮৩টি দেশে করোনার নতুন স্ট্রেইন বা ধরন ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন এই ধরন নিয়ে প্রতিটি বিভাগে বিশদভাবে চিন্তা করতে হবে। আতঙ্কিত নয় বরং নিয়ম মেনে চললে পরে সংক্রমণ কমে আসবে। বাইরের দেশের সঙ্গে বিমানপথে যোগাযোগে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে কিছু দেশের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা শিথিল রাখতে হবে। বাইরের দেশ থেকে কেউ এলে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প কিছু নেই।
আমরা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন নিতে সক্ষম হয়েছি। অনেক মানুষ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছে। অনেকে সুস্থ আছেন। কেউ কেউ আবার ভ্যাকসিন দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই করোনা সংক্রমিত হয়েছে। এতে ভয়ের কিছু নেই। শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হবার জন্য ১৪-২১ দিন সময়ের প্রয়োজন। তাছাড়া এখনো ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া বাকি। যারা প্রথম ডোজ দিয়েছেন তাদেরও সতর্ক তার সঙ্গে চলাচল করতে হবে। কারণ ভ্যাকসিন নিলেই করোনা চলে যাবে—এমন ভ্রান্ত ধারণা রাখা যাবে না। সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে, ভ্যাকসিন গ্রহণের জন্য সবাইকে উত্সাহিত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। ভ্যাকসিন গ্রহণের ফলে শরীরে রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়বে, এতে করে কেউ করোনা সংক্রমিত হলেও তার ঝুঁকি বেশি গুরুতর বা ভয়ের হবে না। আমরা শুরুর দিকে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে লড়াই করেছি, এখনো যেন সেভাবেই সচেতন থাকি। আমরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখব, প্রয়োজন ব্যতীত জনসমাগম এড়িয়ে চলার চেষ্টা করব। জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুই আমরা স্বাভাবিক রাখব, তবে তা সামগ্রিক প্রয়োজনের সুবাদে, অবশ্যই তা যেন স্বাস্থ্যবিধি ও নিয়ম মেনে হয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ