স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অগ্নিঝরা মার্চ

বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক সম্মানের নাম

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘটনাবহুল মাস মার্চ ও ডিসেম্বর। একাত্তরের ১৩ মার্চ আমি ট্রেনে যাত্রা করলাম ময়মন-সিংহের উদ্দেশে।

লক্ষ্য ময়মনসিংহের ইপিআর হেডকোয়ার্টার দখলের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। তত দিনে আমরা বুঝে গেছি মুক্তিযুদ্ধ অত্যাসন্ন। ১ মার্চ থেকে যে ঘটনাপ্রবাহের শুরু এবং তখনো যেভাবে রাজনৈতিক ঘটনাবলী প্রবাহমান, তাতে সচেতন যে কোনো মানুষেরই বুঝে ফেলার কথা যে চরম একটি ব্যবস্থা ছাড়া পাকিস্তানের জন্য আর কিছু খোলা নেই।

১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান যখন ৩ মার্চের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করে বক্তৃতা করলেন, সেই বক্তৃতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব বাংলার মানুষ যেন একসঙ্গে গর্জে উঠল। খণ্ড খণ্ড মিছিল নামল সারা ঢাকা শহরে। প্রত্যেকেই যেন সশস্ত্র মনেপ্রাণে। সবার হাতেই কোনো না কোনো অস্ত্র। বাস-লাঠি হাতে ইটের টুকরো অথবা পাথর নিয়ে এই প্রথম ঢাকা প্রত্যক্ষ করল একটি সশস্ত্র মিছিল। মিছিলের স্লোগান—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’, ‘ইয়াহিয়ার মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

উত্তেজিত জনতার ধাবমান মিছিল এই পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঢাকা স্টেডিয়ামে চলমান পাকিস্তান ও এমসিসি দলের ক্রিকেট ম্যাচ বন্ধ হয়ে গেল। দর্শক প্যান্ডেলে আগুন ধরিয়ে স্লোগান দিতে দিতে বাইরে চলে এলো। শহরের মিছিলগুলো ক্রমে চলতে চলতে জড়ো হলো মতিঝিলে পূর্বাণী হোটেলের সামনে, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় পরিষদ সদস্যদের নিয়ে আসন্ন ৩ মার্চের সংসদ অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য সংবিধান রচনার কাজ করছিলেন। জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু সংক্ষিপ্ত ভাষণে বললেন, অচিরেই তিনি পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।


২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে ছাত্রনেতারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলেন। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের সমাবেশে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হলো। বঙ্গবন্ধু এই সমাবেশে অনির্ধারিতভাবে উপস্থিত হয়েছিলেন। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সারা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিল।

শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার পালা। প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করল ছাত্র-যুবক ও তরুণ-তরুণীরা। বাংলাদেশের সর্বত্রই দেখা যেতে লাগল এই চিত্র। তখন আমি নিজেও এই তরুণ অভিযাত্রী দলের একজন। হাতে সময় নেই। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে অত্যন্ত দ্রুত। যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান, সেখান থেকেই দখল করে নিতে হবে অস্ত্র এবং তাই নিয়ে শুরু করতে হবে গেরিলা যুদ্ধ। পাকিস্তানের সামরিক সরকার নতুন করে অধিবেশনের তারিখ ঘোষণা করেছে ২৫ মার্চ। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করে শর্ত দিয়েছেন অবিলম্বে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের এবং সামরিক শাসন প্রত্যাহারের। পাকিস্তানিরা তখন আলোচনার প্রস্তাব করে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমান ও জাহাজে করে অস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে আসতে শুরু করে। এ সময় বাংলাদেশ কার্যত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে চলছে। তার নির্দেশাবলি প্রেস রিলিজ দিয়ে প্রচার করছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ। সেভাবেই চলছে পূর্ব বাংলার সরকার ও মানুষ।

পাকিস্তানিরা এর মধ্যেই চালাতে থাকল প্রহসনের আলোচনা। ২৫ মার্চ কাউকে কিছু না জানিয়ে গোপনে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করলেন। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল যে কোনো সময় সামরিক আক্রমণের। আতঙ্কের মধ্যেও ছাত্র-যুবকেরা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে শুরু করেন। রাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী শুরু করে তাদের ঘৃণ্যতম নৃশংস আক্রমণ। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ প্রচারিত হলো ওয়্যারলেসের মাধ্যমে। এই স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হলো বাংলাদেশের রাজনীতির সশস্ত্র যুদ্ধের পর্ব, যে যুদ্ধে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়লাম ২৬ মার্চ থেকে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জন্ম নিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাখ লাখ শহিদের রক্তদানের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ আজ ৫০ বছরে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক সম্মানের নাম!

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত

 

ইত্তেফাক/এনএ