ঝুড়িভর্তি কনফেকশনারি ঘুষ দিলেই জেতা যায় গ্র্যামি!

জাইন মালিক বলে কী! হাত না মেলালে আর উপহার না পাঠালে নাকি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে মনোনয়নের জন্য বিবেচনাই করা হয় না। বিশ্বসংগীতের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পুরস্কার বিতরণের পাঁচদিন আগে ভোটারদের ওপর রেগে আগুন হয়ে টুইটারে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ব্রিটিশ এই তারকা একইসঙ্গে লিখেছেন, ‘আগামী বছর একঝুড়ি কনফেকশনারি পাঠিয়ে দেবো।’ 

গ্র্যামিতে কখনোই মনোনীত হননি জাইন। একক গানের জন্য তো নয়ই, এমনকি ওয়ান ডিরেকশন ব্যান্ডের হয়েও তার কপালে মনোনয়ন জোটেনি। ভাগ্যের পরিহাস, ওয়ান ডিরেকশন ব্যান্ডের হয়ে সাফল্য পাওয়ায় ২০১৭ সালে সেরা নতুন শিল্পী শাখায় তাকে ডিসকোয়ালিফাইড করা হয়। এর পরের বছর 'ফিফটি শেডস ডার্কার' ছবিতে টেলর সুইফটের সঙ্গে তার দ্বৈত ‘আই ডোন্ট ওয়ানা লিভ ফরএভার’ ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার সেরা গান হিসেবে মনোনয়ন পেলেও শুধু এর গীতিকার-সুরকাররা স্বীকৃতি পেয়েছেন।  

গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত জাইনের নতুন অ্যালবাম ‘নোবডি ইজ লিসেনিং’ হিসাবের খাতায় নেই এবারের আসরে। কারণ আয়োজকদের বেঁধে দেওয়া সময়ের (২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট) পর এটি মুক্তি পেয়েছে।

গত ৯ মার্চ প্রথম টুইটের আধঘন্টা পর আরেকটি টুইটে নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যায় জাইন দাবি করেন, এটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বা তার অ্যালবামকে গ্র্যামির মনোনয়নের জন্য উপযুক্ত বোঝাতে বলেননি। বরং তিনি মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার কথায়, ‘বর্তমান পদ্ধতিতে স্বজনপোষণ, বর্ণবাদ ও লিয়াজোঁ রাজনীতি ভোটকে প্রভাবিত করে।’

জাইনের ক্ষোভকে বলা যায় দ্য উইকেন্ডের প্রতিধ্বনি। কানাডিয়ান এই সংগীতশিল্পী এবারের মনোনয়ন তালিকায় জায়গা না পেয়ে অভিযোগ তোলেন, গ্র্যামি আয়োজকরা দুর্নীতিগ্রস্ত। তার ‘ব্লাইন্ডিং লাইটস’ গানটি রেকর্ডসংখ্যক ৫২ সপ্তাহ ধরে ইউএস টপচার্টের শীর্ষ দশে আছে। ফলে গ্র্যামির সামনের সারির শাখায় তার নাম ব্যাপকভাবে প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু ৮৪টি শাখার সবক'টিতে তাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি এটাকে `আক্রমণ' হিসেবে দেখছেন। বিলবোর্ড ম্যাগাজিনকে দেওয়া তার মন্তব্য, ‘আমি কোনো হাসির পাত্র নই। আমি অহঙ্কারিও নই। সবাই বলেছে আমি মনোনয়ন পেতে যাচ্ছি। গোটা দুনিয়া আমাকে বলেছে।’

দ্য উইকেন্ড ইতিমধ্যে গ্র্যামি বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। আর নিজের কোনো গান-বাজনা জমা দেবেন না তিনি। নতুন এক বিবৃতিতে তার সাফ কথা, ‘আমার গান গ্র্যামিতে পাঠানোর অনুমতি প্রকাশকদের আর দেবো না।’

গ্র্যামির কোনো আসরে আর যাবেন না বলেও উল্লেখ করেছেন দ্য উইকেন্ড, যতদিন না রেকর্ডিং অ্যাকাডেমি ‘গোপন কমিটি’র কাছ থেকে মুক্ত হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই কমিটি অনেক শাখার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয় কারা মনোনয়ন পাবে।

এমনিতেই অস্বচ্ছ হিসেবে গ্র্যামির ভোট পদ্ধতির দুর্নাম আছে। ৮৪টি শাখার মধ্যে ৭২টির ক্ষেত্রে রিভিউ কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের মধ্যে আছেন সংগীতশিল্পী, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি ও গুণীজনেরা। ভোটারদের পছন্দ পর্যালোচনা করে তারাই চূড়ান্তভাবে ঠিক করে দেন কারা জায়গা পাবে সংক্ষিপ্ত তালিকায়। আয়োজকরা যদিও দাবি করেন, মনোনীত ও বিজয়ীদের নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয় সেদিকে গুরুত্ব আরোপ করেন তারা। কিন্তু অনেক শিল্পী এই প্রক্রিয়াকে সন্দেহজনক মনে করেন, তাদের মতে, এর মাধ্যমে ভোট বদলে ফেলা যায়।

তাছাড়া ভোটের ব্যাপারে গত বছর ন্যাশনাল একাডেমি অব রেকর্ডিং আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের সাবেক প্রধান নির্বাহী ডেবোরা ডুগ্যান গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। অসদাচরণের দায়ে পদচ্যুত হওয়ার পর তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তার দাবি, যৌন হেনস্তা ও অসাধু ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ খোলায় তাকে আকস্মিকভাবে অপসারণ করা হয়েছে।

তার দাবি, যারা অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন পুরস্কার প্রদানে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, সংগীতশিল্পী ও তাদের প্রতিনিধিরা ‘গোপন কমিটি’তে বসার অনুমতি পেয়ে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরিতে ভূমিকা রাখেন ও নিজেকে মনোনীতদের দলে যুক্ত করেন বলে অভিযোগ ডুগ্যানের। যদিও তার এমন দাবি রেকর্ডিং একাডেমি মিথ্যা বলে অভিহিত করে।

গ্র্যামি বর্জনের কথা বলা প্রথম সংগীতশিল্পী নন দ্য উইকেন্ড, ড্রেক তার ২০১৮ সালের অ্যালবাম ‘মোর লাইফ’ জমা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এছাড়া ফ্রাঙ্ক ওশান ২০১৭ সালে এই অ্যাওয়ার্ডসে অংশ নেননি।

দ্য উইকেন্ড মনে করেন, ‘পুরস্কার প্রদান ও মনোনয়নের ব্যবস্থা এবং স্ক্রিনিং পদ্ধতির অবকাঠামোটি সেকেলে।’

তবে প্রতিক্রিয়ায় রেকর্ডিং অ্যাকাডেমির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী হার্ভি মেসন জুনিয়রের দাবি, তাদের সংগঠন প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘কেউ মর্মাহত হয়ে থাকলে আমরা সবাই হতাশ হই। তবে আমি বলবো, আমরা প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছি। বিগত বছরগুলোর মতো এবার আমরা মনোনয়ন রিভিউ কমিটিসহ কীভাবে আমাদের পুরস্কারের প্রক্রিয়া উন্নত করা যায় সেদিকে কড়া নজর রাখবো।’

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলস কনভেনশন সেন্টারে ১৪ মার্চ (বাংলাদেশ সময় সোমবার) অনুষ্ঠিত হবে ৬৩তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস। করোনাকালের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারফর্মার, মনোনীত শিল্পী ও অতিথিদের জন্য থাকছে চারটি বৃত্তাকার পৃথক মঞ্চ। পুরস্কার তুলে দেওয়ার দায়িত্বে থাকছেন বারটেন্ডার, নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তাদের জন্য রাখা হয়েছে পঞ্চম মঞ্চ। 

নাচে-গানে মঞ্চ মাতাবেন বিলি আইলিশ, হ্যারি স্টাইলস, দুয়া লিপা, টেলর সুইফট, কার্ডি বি, বিটিএস ব্যান্ডসহ অনেকে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করবেন দক্ষিণ আফ্রিকান উপস্থাপক ট্রেভর নোয়া।

এবারের আসরে সর্বাধিক ৯টি শাখায় মনোনয়ন পেয়েছেন বিয়ন্সে। এর মধ্যে চারটি এনে দিয়েছে গত বছর ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সময় প্রকাশিত ‘ব্ল্যাক প্যারেড’ গানটি। তিনি এবার চারটি পুরস্কার পেয়ে গেলে গ্র্যামিতে সবচেয়ে ট্রফি জেতা নারী হিসেবে অ্যালিসন ক্রাউসকে টপকে যাবেন। আর যদি আটটি পান তাহলে সর্বাধিক গ্র্যামি বাগিয়ে নেওয়ার শীর্ষস্থান দখল করবেন। এখন এই সিংহাসনে আছে হাঙ্গেরির ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডাক্টর স্যার গেওর্গ সরতির নাম।

দুয়া লিপা ও টেলর সুইফট পেয়েছেন ছয়টি করে মনোনয়ন। লকডাউনের সময় প্রকাশিত ‘ফোকলোর’-এর সুবাদে অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার পুরস্কারের জন্য ফেবারিট সুইফট। তিনি জিতে গেলে প্রথম গায়িকা হিসেবে বর্ষসেরা অ্যালবাম শাখায় তিনবার জয়ের রেকর্ড করবেন। এর আগে কেবল তিনজন এই কীর্তি গড়তে পেরেছেন। তারা হলেন-ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পল সায়মন এবং স্টিভি ওয়ান্ডার।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম কোনো ব্যান্ড হিসেবে গ্র্যামিতে ইংরেজি গান ‘ডিনামাইট’-এর সুবাদে মনোনয়ন পেয়েই ইতিহাস গড়েছে বিটিএস। সেরা পপ দল/দ্বৈত পারফরম্যান্স শাখায় সাতজনের ব্যান্ডটির প্রতিদ্বন্দ্বী লেডি গাগা ও আরিয়ানা গ্রান্ডের ‘রেইন অন মি’, টেলর সুইফট ও বন আইভারের ‘এক্সাইল’, জাস্টিন বিবার ও কোয়াভোর ‘ইনভেনশনস’।

সেরা র‌্যাপ গান শাখায় ‘স্যাভেজ (রিমিক্স)’-এর সুবাদে পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়তে পারেন মেগান দি স্টালিয়ন। কারণ এর আগে কখনো কোনো নারী র‌্যাপারের ঝুলিতে এই অর্জন নেই। তার ও বিয়ন্সের ‘স্যাভেজ (রিমিক্স)’ গানটি রেকর্ড অব দ্য ইয়ার শাখায় ফেবারিট। গ্র্যামির ইতিহাসে কেবল একবারই কোনো র‌্যাপ গান এই স্বীকৃতি পেয়েছে (চাইল্ডিশ গ্যাম্বিনোর ‘দিস ইজ আমেরিকা’)।

প্রথমবারের মতো সেরা রক পারফরম্যান্স শাখায় মনোনীত সবাই নারী। তারা হলেন ফিবি ব্রিজারস, হাইম, ব্রিটানি হাওয়ার্ড, বিগ থিফ, গ্রেস পটার এবং ফিওনা অ্যাপল। তাদের মধ্যে ফিওনা ‘ফেচ দ্য বোল্ট কাটারস’-এর সুবাদে গ্র্যামির সর্বোচ্চ সম্মান সেরা অ্যালবাম শাখার মনোনয়নও পেয়েছেন।

অস্কারে সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপ্রাপ্ত অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপের সামনে জীবনের প্রথম গ্র্যামি জয়ের হাতছানি। অডিওবুক শাখায় মনোনীত ইবি হোয়াইটের ধ্রুপদী গল্প ‘শার্লোটস ওয়েব’-এর ধারাবর্ণনা তার।

হলিউড অভিনেতা উইল ফেরেলের ‘দ্য স্টোরি অব ফায়ার সাগা’ (নেটফ্লিক্স) সেরা কম্পাইলেশন সাউন্ডট্র্যাক ফর ভিজ্যুয়াল মিডিয়া শাখায় মনোনীত হয়েছে। এতে রয়েছে ইউরোভিশন প্যারোডি।

ইতিহাসে কেবল একটি ইউরোভিশন গান গ্র্যামি জিতেছে। ১৯৫৮ সালের ইউরোভিশনে তৃতীয় হওয়া ইতালির ডমেনিকো মোদুনোর ‘নেল ব্লু, দিপিন্তো দি ব্লু’ পরের বছর প্রথম গ্র্যামিতে সং অব দ্য ইয়ার এবং রেকর্ড অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জেতে। এরপর কেবল ১৯৯৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার জিনা জি'র গাওয়া ‘ওহ আহ...জাস্ট অ্যা লিটল বিট’ সেরা ড্যান্স রেকর্ডিং শাখায় মনোনীত হয়।

সবশেষে একটা বিতর্কের কথা বলা যাক। সামনের সারির চারটি শাখার মধ্যে রেকর্ড অব দ্য ইয়ারের জন্য মনোনীত হয়েছে ডোজা ক্যাটের ‘সে সো’। এটি তার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করেছেন ড. লিউক। তিন বছর আগে তার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন গায়িকা কেশা। তাকে সেই দুঃসময় পেরিয়ে আসা সম্পর্কিত একটি গান গাইতে গ্র্যামিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ২০১৮ সালে। তার কারণে ডোজা ক্যাট কি কম ভোট পাচ্ছেন? তিনি যদি জিতেও যান, কেউ কি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে? গ্র্যামি সরাসরি হতে যাচ্ছে, তাই যেকোনো কিছু ঘটতে পারে এই আয়োজনে!

ইত্তেফাক/এএইচপি