দেশের শিল্পায়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। আনুষ্ঠানিক খাতের বাইরেও নারী উদ্যোক্তারা অনানুষ্ঠানিক উত্পাদনশীল খাতে তাদের অবদান রেখে চলেছেন। নারী উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই অতিক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে নিয়োজিত। এই খাতে আগে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ খুব একটা পাওয়া যেত না। ফলে নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের চাহিদা পূরণের জন্য গ্রামীণ মহাজন, এনজিও এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে ব্যবসায়রত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণ করতে হতো। এতে নারী উদ্যোক্তাদের উত্পাদিত পণ্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি পড়তে হতো। নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থায়ন প্রাপ্তি সহজীকরণ করার জন্য সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বেশ কিছু কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় এসএমই (স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ) খাতের সংজ্ঞায় পরিবর্তন সাধন। বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তি সহজীকরণ করার জন্যই এই উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া গত বছরই মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদানের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকারের এসব বাস্তবানুগ উদ্যোগের ফলে নারী উদ্যোক্তাদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে বিশেষ ট্রিটমেন্ট দেওয়ার জন্য দেশের শিডিউল ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সব ব্যাংকেরই রয়েছে পৃথক ডেস্ক। এসব আয়োজন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পরও নারী উদ্যোক্তারা তাদের চাহিদামতো ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন না। জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬তে বলা হয়েছে, এসএমই খাতের মোট ব্যাংক ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তার মধ্যে বিতরণ করতে হবে। উপরন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনা রয়েছে, পুনঃঅর্থায়ন ঋণের অন্তত ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের দিতে হবে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত নারী উদ্যোক্তাগণ ব্যাংক ঋণের মাত্র ৫ শতাংশ পেয়েছেন। সরকার করোনা সংক্রমণ মোকাবিলার জন্য যে ঋণ প্রণোদনা দিয়েছে, সেখান থেকে নারী উদ্যোক্তাগণ পেয়েছেন মাত্র ৫ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। করোনাকালীন যে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়, তার সুদের হার হচ্ছে ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তাগণ প্রদান করবেন এবং অবশিষ্ট ৫ শতাংশ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদান করবে। করোনাকালীন ঋণ প্রণোদনার বাইরে সামগ্রিকভাবে এসএমই খাতে মোট ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাগণ পেয়েছেন প্রায় ৪ শতাংশ।
বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ট্র্যাডিশনাল ব্যাংকের একশ্রেণির কর্মকর্তা আছেন, যারা নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানের ক্ষেত্রে মোটেও উত্সাহী নন। তারা চেষ্টা করেন কীভাবে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিশেষ করে উত্পাদনমুখী খাতে ভালো করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা পুরুষ প্রতিযোগীদের চেয়েও ভালো করছেন। কিন্তু তারা যখন ব্যাংকে ঋণের জন্য আসেন, তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না। কোনো নারী উদ্যোক্তা ব্যাংকে ঋণের জন্য এলে এমন সব ডকুমেন্টস চাওয়া হয়, যা তাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয় না। ব্যাংক কর্মকর্তারা বৃহত্ আকারের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যতটা আগ্রহী, কম অঙ্কের ঋণদানের ক্ষেত্রে ততটাই অনাগ্রহী। এছাড়া বড় প্রকল্পে বৃহত্ আকারের ঋণ দেওয়া গেলে টার্গেট পূরণ করা সহজতর হয়। তাই ব্যাংকারগণ কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না। সমস্যা আরো আছে। সম্পদের মালিকানায় নারী উদ্যোক্তাদের অংশীদারিত্ব থাকে না। তারা পিত্রালয় থেকে ওয়ারিশ সূত্রে যে সম্পত্তির মালিকানা লাভ করেন, তার বাস্তব দখল বুঝে পেতে অনেক সময় বিলম্ব হয়। স্বামীর কাছ থেকেও তারা চাইলেই সম্পত্তির মালিকানা আদায় করে নিতে পারেন না। ফলে ঋণ গ্রহণের সময় ব্যাংকের চাহিদামতো জামানত দিতে পারেন না। মন্ত্রিপরিষদের সভায় নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণদানের প্রস্তাব পাশ করা হলেও কোনো ব্যাংকই এই প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়ন করেনি। আসলে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত। তারা নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণদানের ক্ষেত্রে মোটেও আগ্রহী নন।
এদিকে বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (বিডব্লিউসিসিআই) নারী উদ্যোক্তাগণ যাতে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণ পেতে পারেন, সেই লক্ষ্যে লবিং শুরু করেছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে যেসব নারী উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য প্রণোদনার বাইরেও সহজ শর্তে জামানতবিহীন সাধারণ ঋণ দাবি করেছে এই সংগঠন। ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে তারা একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা পাঠিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, যেসব নারী উদ্যোক্তা করনোকালীন ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তাদের জন্য ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সহজ শর্তে ৪ শতাংশ সুদে জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিডব্লিওসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট সেলিমা আহমাদ সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। সংগঠনটি বলছে, যারা এসএমই খাতে নতুন করে শিল্প স্থাপন অথবা ব্যবসায় শুরু করবেন, তাদের প্রথম তিন বছর ভ্যাট ও আয়কর প্রদান থেকে মুক্তি দিতে হবে। আগামী অর্থবছরের (২০২১-২০২২) জাতীয় বাজেটে এসএমই খাতের জন্য ২০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। সেবা খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ যেমন—বুটিক, বিউটি পার্লার, ক্যাটারিং, খাবারের দোকান ও অন্যান্য খাদ্যের ব্যবসায় ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে। নারীদের করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। করোনাকালীন যেসব নারী উদ্যোক্তা তাদের শিল্প বা ব্যবসায়-বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বার্থে আগামী দুই বছরের জন্য ভ্যাট ও আয়কর প্রদান থেকে মুক্তি দেওয়াসহ ট্রেড লাইসেন্স ফি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। তারা অভিযোগ করেন, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের দ্বারা পরিচালিত ব্যবসায়ের শো-রুমের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঠিকই ভ্যাট আদায় করেন। ফলে নারী উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নারী উদ্যোক্তাগণ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছেন, কিন্তু তাদের সেই অবদান এখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। জাতীয় অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবদান জিডিপির প্রায় ৮৭ শতাংশ বলে একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উত্পাদন কার্যক্রমে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়। কিন্তু সেই অবদান জিডিপি ক্যালকুলেশনের সময় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। নারীদের শ্রমে অর্জিত উত্পাদনের সুফল যদি জাতীয় অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত করা যেত, তাহলে দেশে জিডিপির পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেতো। যেসব নারী উদ্যোক্তা এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে উত্পাদনরত আছেন, তাদের ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য আর্থিক সহযোগিতা করা গেলে তারা অর্থনীতির মূল শ্রোতে চলে আসার জন্য আগ্রহী হতেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও বর্তমানে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এসডিজি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এসডিজির একটি বিশেষ শর্ত হচ্ছে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। নারীরা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। তাদের পেছনে ফেলে রেখে কোনোভাবেই কার্যকর ও টেকসই জাতীয় উন্নয়ন আশা করা যায় না। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কিছু প্রণোদনা রাখা যেতে পারে।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক