সুন্দরবন আমাদের রক্ষাকবচ!

বাংলাদেশের জন্য সুন্দরবনকে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদই বলা চলে। কেননা যুগ যুগ ধরে ভয়ংকর ও প্রলয়ংকরী সিডর, বুলবুল, ফণী, আম্ফানসহ অসংখ্য ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে চলেছে সুন্দরবন। ফলে প্রতি বছর উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ও ফসলের যতটা ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা হয়নি।

আমাদের সামগ্রিক জীবনের ওপর সুন্দরবনের ভারসাম্যপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশের যে অবদান, সেটির অর্থমূল্য আমরা স্বচক্ষে দেখি না বলে সুন্দরবনের মূল্য আমাদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু, মাথাপিছু আয়, সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের ব্যয় ইত্যাদি বিবেচনায় সুন্দরবনের সঙ্গে একটি তুলনামূলক আর্থিক মূল্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সুন্দরবন যেভাবে মানুষের জীবন রক্ষা করছে, বছরে তার আর্থিক মূল্য ১৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

সুন্দরবন আমাদের ২৪টি ইকোসিস্টেম সেবা প্রদান করে থাকে। বিশ্বে মোট ৪৮ প্রজাতির শ্বাসমূলীয় বৃক্ষ রয়েছে, যার ১৯ প্রজাতিই রয়েছে আমাদের সুন্দরবনে। এমনকি বিশ্বের ৩৩ প্রজাতির বিপন্ন প্রাণী সুন্দরবনকে আশ্রয় করে টিকে আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ম্যানগ্রোভ বনের ওপর পরিচালিত ১৩০টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে ২০১২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবন এক বছরে ২৭ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৭১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ইকোসিস্টেম সেবা প্রদান করে থাকে। এই ইকোসিস্টেমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে হাজার হাজার প্রাণী এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে থাকে সুন্দরবন। শুধু তাই নয়, সুন্দরবন বিশাল আয়োজনে আমাদের করে থাকে অক্সিজেনসেবা প্রদান, বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ থেকে উত্পন্ন হয়ে থাকে মরণব্যাধি রোগের ওষুধ, বিভিন্ন গাছ খাদ্যের জোগান দেয় বন্যপ্রাণীদের এবং প্রচ্ছন্ন দূষণ থেকেও পরিবেশকে রক্ষা করতে সক্ষম।

আমাদের জীবনে সুন্দরবনের এত অবদানের পরেও প্রায়শই পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, বিভিন্নভাবে নির্বিকারে গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে সুন্দরবনকে। অভয়ারণ্যে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারে দুষ্কৃতকারী চক্রের তত্পরতা দিনদিন বেড়ে চলেছে। চোরা শিকারিদের হাতে মারা পড়ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হত্যা করা হচ্ছে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। ফলে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সব ঘাট ম্যানেজ করেই খুব গোপনে গাছ, মাছ ও পশু শিকার করে পাচার করা হচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, যার প্রচ্ছন্ন প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে আমাদের এবং আমাদের পরিবেশের ওপর।

বিবিসি বাংলার তথ্যমতে—যেভাবে অবাধে বৃক্ষ নিধন চলছে তাতে  আগামী ২০ বছরে সুন্দরী গাছগুলো বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবনের গত ১৫ বছরে বাঘ কমেছে ৮৬ শতাংশ। প্রতি বছর শিকার করা হচ্ছে ১০-১২ হাজার হরিণ। একসময় সুন্দরবনে ৪০০ প্রজাতির পাখি ছিল। শিকারের কারণে যা এসে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৭০ প্রজাতিতে, মাছ এসে দাঁড়িয়েছে ১২০ প্রজাতিতে। যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য ছিল এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ।

প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন ও জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে বিশ্বের জন্য অসামান্য অবদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জীববৈচিত্র্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কতটা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে, তা বলার অবকাশ রাখে না। কাজেই সুন্দরবনকে রক্ষায় রাষ্ট্রের অধিক মনোযোগী হতে হবে, বন অপরাধীদের দৌরাত্ম্য রোধে বন রক্ষীদের তত্পরতাও বাড়াতে হবে। নেতিবাচক বিভিন্ন প্রভাব থেকে সুন্দরবনকে আগলে রাখতে হলে উন্নয়ন বিবেচনায় যেমন দূরদৃষ্টিপ্রসূত হতে হবে, তেমনি এর সুরক্ষার বাস্তবিক কাঠামোকেও কার্যকর রাখতে হবে। একই সঙ্গে অসাধু বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও কর্তৃপক্ষের সচেতন দায়বদ্ধতা।

সুন্দরবন আমাদের জীববৈচিত্র্য ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের অন্যতম রক্ষাকবচ। সুন্দরবন বিনষ্ট হওয়া মানে বাংলাদেশের আয়ু কয়েক দশক কমিয়ে আনা, মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা। তাই এর সুরক্ষার দায়িত্বও আমাদেরই এ সমাজ ও রাষ্ট্রের। জনতাকে ফের যেন ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ স্লোগান দিতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি রেখে এবং দায়িত্বের কথা মনে রেখেই কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে—সুন্দরবন বাঁচলে, বাঁচবে বাংলাদেশ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়