ইট উত্পাদনের জন্য উত্কৃষ্ট হচ্ছে জমির ওপরের অংশের মাটি। ইটভাটার মালিকেরা কৃষকদের লোভ দেখিয়ে এককালীন অল্প কিছু টাকা দিয়ে চাষাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জমির ওপরের অংশের মাটি কেটে নিয়ে যায় ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করার জন্য। আধুনিক বিশ্বে ইটের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, কিন্তু নিয়ম না মেনে এই প্রয়োজনীয় বস্তু তৈরিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও তার উপাদান। কৃষিকাজে উর্বর মাটি অত্যন্ত উপকারী। ইট তৈরিতে পোড়ানো হচ্ছে শত শত একর জমির ওপরের অংশ, যার ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষিক্ষেত্র। ইটভাটার আশপাশের জমিতে কোনো প্রকার ফসল ফলে না। ফলে একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকে। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্রভাবে ১৪টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ইটভাটায় অতি নিম্নমানের কয়লা পোড়ানোর কারণে ১৪ হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে ফসল উত্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয় বিভিন্ন ধরনের গাছপালা। এসব গাছের জোগানও দিতে হয় কৃষকদের। অনাদরে গাছপালা কেটে ফেলায় অনেক প্রজাতির পশু-পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। শুধু তাই নয়, গাছের শিকড় পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। কোনো কিছু না ভেবে বৃক্ষনিধনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৭০০, যার মধ্যে প্রায় ৫০ ভাগই অবৈধ। গত ২০০১ সাল থেকে ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলেও তা অবাধে ব্যবহূত হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ২০১৭ পর্যন্ত ইটভাটার সংখ্যা হচ্ছে ৬ হাজার ৭৭০। এর মধ্যে ৪ হাজার ১০৭টি জিগজ্যাগ ও উন্নত জিগজ্যাগ, ২ হাজার ৫৪১টি ১২০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনি ভাটা এবং ১২১টি এইচএইচকে ও টানেল ভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য এবং বিভিন্ন মাঠ পর্যায়ের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৭০০। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০টির অধিক ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা, ৪ হাজার ৭০০টি জিগজ্যাগ উন্নত জিগজ্যাগ, ৩ হাজার ৭৫টি ১২০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনি ভাটা এবং ১২৫টি এইচএইচকে ও টানেল ভাটা। ৪ হাজার ৮২৫টিতে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স রয়েছে, যা মোটেই টভাটার ৫০ শতাংশ বা ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা ছাড়া ইটভাটাসমূহের ৬১ শতাংশ। এসব ইটভাটায় ২৭ লাখ ৬৩ হাজার টন কাঠ এবং ৬৭ লাখ ১৫ হাজার টন কয়লা পোড়ানো হয়।
পরিবেশ রক্ষা, সর্বোপরি নিজেদের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য হলেও অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হবে এবং ইটের ব্যবহার কমাতে হবে। ইট তৈরি থেকে পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে পরিবেশকে এবং আমাদের স্বাস্থ্যকে। তাই সময় হয়েছে ইটের ব্যবহার কমানো এবং বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করার। কিন্তু আমাদের দেশে ইটের ব্যবহার এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে, এর বিকল্প ব্রিকস কিংবা স্টিল কিংবা কাচের তৈরি ভবনের প্রতি আকর্ষণ অনেক কম। তাই আমাদের জোর দেওয়া দরকার ইট তৈরিতে, যেন সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হয় তার দিকে। যেসব ইটভাটা থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত হয়, তা অচিরেই বন্ধ করা এবং সব ইটভাটায় কার্বন নিঃসরণজাল ব্যবহার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। অন্যথায় ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া এবং যথাযথ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা। ইটভাটার ইট পরিবহনের ক্ষেত্রে আরো সচেতন হতে হবে। ট্রাক্টর কিংবা অকেজো প্রায় পরিবহন পরিহার করে উন্নতমানের যানবাহন ব্যবহার করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে যানবাহন চলাচলের ফলে যেন ধুলাবালু খুব বেশি পরিমাণে না হয়, সে জন্য ইটভাটা কর্তৃপক্ষকে রাস্তায় পানি ছিটানো এবং বর্ষা মৌসুমে রাস্তার খানাখন্দক ইটভাটা কর্তৃপক্ষকে নিজ দায়িত্বে পূরণ করতে হবে এ ধরনের একটি আইন পাশ করা এখন সময়ের দাবি মাত্র।
ফসলি জমি, বসতবাড়ি, বনজঙ্গল থেকে দূরে যেন প্রতিটা ইটভাটা তৈরি করা হয়, সেদিকে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ সভ্যতার এই যুগে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে কংক্রিটের দেওয়াল তথা ইটের তৈরি দেওয়াল এমনভাবে যুক্ত হয়ে গেছে যে, আমরা চাইলেও অতি তাড়াতাড়ি এটি এড়িয়ে চলতে পারব না বা এর ব্যবহার একেবারে কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ আমাদের দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার পরিমাণ অনেক বেশি, তাই নগরজীবনে বহুতল ভবন অতিপ্রয়োজনীয় একটি বিষয়। বাসস্থানের জন্য যেমন ইটের ব্যবহার খুবই দরকারি, তেমনি পরিকল্পিতভাবে ইটভাটাগুলো পরিচালনা করাও অতীব জরুরি। সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং পরিকল্পিতভাবে ইটভাটাগুলো পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য নিজ নিজ জায়গা থেকে আমাদের প্রত্যেকের নিজের দায়িত্বটুকু পালন করতে হবে। আমরা নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করলেই সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে পরিকল্পিতভাবে সব ইটভাটা পরিচালনা করা। অন্যথায় তা কখনোই সফলতার মুখ দেখবে না। তাই আমরা সবাই নিজেরা সচেতন হয়ে সরকারকে সাহায্য করি তাদের নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য।
n লেখক : শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়