শিশু দিবস পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হোক

স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির নিষ্পাপ ও সর্বাপেক্ষা সুন্দর পর্যায়ে অবস্থান করা সেই মানব কিংবা মানবী হলো শিশু। বয়সের গন্ডি ধরে বলতে গেলে সাধারণত ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে ১৫ বছরের বালক-বালিকারা শিশু হিসেবে অভিহিত হয়। শিশু বরাবরই কোমলমতি হয়। শিশুদের ভালোবাসে না, এমন মানুষ বোধহয় সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জন্মদিন কাটাতেন শিশুদের সঙ্গে। শিশুদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন তিনি। শিশুরাও দলবেঁধে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে যেত। এভাবেই ১৭ মার্চকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে।

প্রত্যেকটি শিশুই অপার সম্ভাবনার আধার। একটি জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির বীজ সুপ্ত অবস্থায় লুকায়িত থাকে শিশুর মধ্যেই। একটি শিশু জন্ম নেওয়া মানে যে শুধু সেই শিশুটার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে এমনটা কিন্তু নয়, বরং একটি জাতির উন্নতির সঞ্চার হয় সুষ্ঠু পরিবেশে বিকশিত হওয়া সেই শিশুর দ্বারা। একটি মহত্ জাতি গড়ে তোলার মূল পন্থা হলো—উন্নত চরিত্র এবং সুগঠিত বিকাশপ্রাপ্ত শিশুর সমন্বয়। শিশুরা ফুলের মতো পবিত্র। প্রত্যেকটি শিশুই হলো ভিন্ন ধরনের ফুল এবং তারা সবাই একসঙ্গে মিলে একটি সুন্দর বাগিচা তৈরি করতে পারে। সেই বাগিচা যা শুধু একটি নির্দিষ্ট জাতি নয়, বরং পুরো বিশ্বকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে।

আজকের শিশুই বড় হয়ে ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির দায়িত্ব গ্রহণ করবে। সমাজ ব্যবস্থাকে উন্নত করে তুলবে। প্রত্যেক শিশুই একটি সাদা কাগজের মতো। সেটার মধ্যে যা লিখা হবে সেটিই ফুটে উঠবে। কথাটার ব্যাখ্যা এভাবেই দেওয়া যায়, শিশুর মন সরল এবং তারা অনুকরণপ্রিয়। তারা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সে পরিবেশের আচার-আচরণ অনুকরণ করে এবং সেভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পরে। অনুকূল পরিবেশ, উপযুক্ত শিক্ষা এবং উপযুক্ত অভিভাবক পেলে যেমন একটি শিশু পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে, ঠিক তেমনই বৈরী ও কুরুচিপূর্ণ পরিবেশ, উপযুক্ত শিক্ষার অভাব, অসত্সঙ্গ এবং বিবেকহীন অভিভাবকের অধীনে শিশু বড় হয়ে অমানুষ ও লম্পট চরিত্রের হতে পারে, যা ভবিষ্যতে সেই জাতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুরা অবহেলিত থাকলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম মুখ থুবড়ে পড়বে।

শিশু দিবস পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে—শিশুদের কল্যাণ সাধন এবং তাদের মৌলিক অধিকার আদায়সহ নানাবিধ সমস্যার সমাধান। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি শিশু-কিশোর রয়েছে। তবে দুঃখের বিষয়, এখনো তাদের অনেকেরই মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। আজও কত শিশু ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভোগে। পরিধান করার মতো বস্ত্র পায় না। রোগশোকে চিকিত্সা পায় না, এমনকি সেবন করার মতো ওষুধ। দারিদ্র্যের কারণে বিপুল সংখ্যক শিশুকে জীবিকার তাগিদে শ্রমদাসে পরিণত হতে হচ্ছে। এখনো অনেক শিশুকে অন্যের গৃহে, হোটেল-রেস্টুরেন্টে, কলকারখানায় কাজ করতে হচ্ছে। যে সময়ে শিশুটির শিক্ষাঙ্গনে বিচরণ করার কথা ছিল, সেই সময়ে তার বিচরণ ঘটছে শ্রমক্ষেত্রে। পরিপূর্ণভাবে প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই পথে-প্রান্তরে কত শিশু নিঃশব্দে অকালে ঝরে যায়, তার কোনো হিসাব নেই।

তাই প্রতি বছর শুধু শিশু দিবস পালন করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রকৃতপক্ষে শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণসহ শিশুর উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য তৈরি করা শিশু সংগঠনগুলোকে আরো দৃঢ়ভাবে কাজ করতে হবে। জাতীয় প্রচারণা ও বিভিন্ন আঙ্গিকের অনুষ্ঠানমালা প্রচার করতে হবে। আমাদের আশপাশে অবহেলিত প্রতিটি শিশুর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। শিশুর সঠিক বিকাশে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশের ব্যবস্থা করতে হবে, তবেই দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়