বাড়িতে-গাড়িতে মূর্তিমান আতঙ্ক সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইরে গত ৮ মার্চ এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের বিস্ফোরণে মারা গেছেন চার জন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন আরো দুই জন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে গত ১১ মার্চ একটি বাসের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনে পুড়ে মারা যান দুই জন। আহত হন ১১ জন। এর আগে ২২ জানুয়ারি কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হন অন্তত তিন জন। ১১ জানুয়ারি বরগুনার পাথরঘাটায় একটি বরফকলে অ্যামোনিয়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এক জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক মানুষ।

দেশে বোতলজাত গ্যাস বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা। বাসাবাড়িতে, যানবাহনে, পথেঘাটে কিংবা কারখানায় থেমে নেই এই দুর্ঘটনা। বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। প্রাণ যাচ্ছে আদমসন্তানের। স্বজন হারাচ্ছে বহু মানুষ। নষ্ট হচ্ছে সম্পদ। দুর্ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে সিএনজি, এলপিজি, অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া, নাইট্রোজেন, হিলিয়ামসহ বিভিন্ন গ্যাস বোতলজাতকরণ বা পাইকারি ব্যবসা পর্যায়ে নীতিনির্ধারণী স্থান থেকে নজরদারি থাকলেও খুচরা বিক্রি পর্যায়ে নজরদারি শূন্যের কোঠায়। খুচরা ব্যবসায়ীরা এবং ব্যবহারকারীদের সিংহভাগই জানেন না সিলিন্ডার রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ম। অনেকে এ ব্যাপারে মনোযোগীও নন।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে প্রায় ২০০ সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। এগুলোর মধ্যে সিংহভাগ বাসাবাড়িতে এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা। ২০১৯ সালে দেশে প্রায় ৮০টি এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ-দুর্ঘটনায় অন্তত ১০০ জন নিহত হন। এর বাইরে অনেকে গুরুতর আহতও হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দোকানে দোকানে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি বড় সমস্যা তৈরি করছে। এই খুচরা বিক্রেতাদের অধিকাংশই সঠিকভাবে সিলিন্ডার সংরক্ষণ করেন না। এটি বন্ধ করা জরুরি। কেননা, খুচরা মুদি দোকানদারদের কাছে থাকা সিলিন্ডারগুলো মৃদু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা তারা বুঝতে পারেন না। পরে ঐ ক্ষুদ্র লিকেজ-ত্রুটি গ্রাহক পর্যায়ে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, খুচরা বিক্রি বা গ্রাহক পর্যায়ে এগুলো দেখভালের দায়িত্ব আমাদের কর্মপরিধিতে নেই। সেই জনশক্তিও আমাদের নেই। আমরা মজুতদারদের লাইসেন্স প্রদান করি, খুচরা পর্যায়ে নয়। এলপিসহ সিলিন্ডার যারা বিক্রি করছে, সেই কোম্পানিগুলোর উচিত এই তদারকি, সচেতনতা ও বিক্রয়-পরবর্তী সেবা প্রদান করা।

ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, বাসাবাড়িতে অনেকে সঠিকভাবে এলপিজি সিলিন্ডার ইনস্টল করতে পারেন না। লিকেজ হলে বুঝতে পারেন না। এ কারণে অনেকগুলো বড় দুর্ঘটনা হয়েছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিক্রয়-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বাজারে নিম্নমানের ও পুরনো সিলিন্ডারের সংখ্যা এখন কমই রয়েছে। তবে খুচরা বিক্রি পর্যায়ে সিলিন্ডারের বডি কিংবা মুখে ক্ষতি হচ্ছে। এটি বিপজ্জনক। এর ফলে দ্রুতই জীবনসীমা কমছে সিলিন্ডারের। এছাড়া কিছুটা কম দামে পাওয়া যায় বলে অনেক গ্রাহক নিম্নমানের সিলিন্ডারের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। আবার অনেক ক্রেতা নিরাপত্তা সিল না দেখেই নিম্নমানের সিলিন্ডার বেশি দামে কিনছেন। অথচ ব্যবহার শুরুর দুই-এক বছর পর এসব সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আশঙ্কা আছে।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা সম্পর্কে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম মেনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এবং যাচাইবাছাই সাপেক্ষে প্রতিটি সিলিন্ডার ৪০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু দেশে সিলিন্ডারগুলো পরিবহন পর্যায়ে বিশেষ করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এগুলোর স্বাভাবিক জীবনকাল কমে যায়। তিনি জানান, ১০ বছর পরপর বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সিলিন্ডার রি-টেস্ট (পরীক্ষণ) করাতে হয়। রি-টেস্টে উত্তীর্ণ হলে প্রতিটি সিলিন্ডার পরবর্তী ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারের অনুমোদন পায় উৎপাদন-বিতরণ কোম্পানিগুলো। তিনি বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে সিলিন্ডার নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি অধিদপ্তরের পক্ষে সম্ভব নয়। কোম্পানিগুলোর স্টোর পর্যন্ত এ মান নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ডিলার কিংবা গ্রাহক পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত সিলিন্ডারগুলো যখন রিফিল করা হয়, তখন কোম্পানিগুলো নিজস্ব তদারকিতে এগুলোকে পরীক্ষা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আর ডিলার ও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই মধ্যবর্তী ১০ বছরে অনেক সিলিন্ডার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফিলিং স্টেশন, স্টোর কিংবা ডিলার পর্যায়ে অনেক সময় এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ, মেয়াদোত্তীর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত সিলিন্ডার চলে যায়। আর ঐগুলো থেকেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়।

সরকারি কোম্পানিসহ বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানি, মজুত ও বিতরণে ২৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন রয়েছে। ৩৮ লাখ গ্রাহকের জন্য ৩ হাজার পরিবেশক ও ৩৮ হাজার খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। বার্ষিক এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ টন। এর ৯৮ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। এলপি গ্যাসের চাহিদা ২০২৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন এবং ২০৩০ সালে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে উন্নীত হতে পারে। এমন অবস্থায় নিরাপদ এলপি ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের মনোযোগ দেওয়া দরকার বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে সারা দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার নিয়ে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলাচল করছে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর গাড়িতে বসানো সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরে ঐ পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার গাড়ি নিয়মিত এই পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়।

ইত্তেফাক/এমআর