৭৪তম কান: বিচারকদের প্রথম কালো নেতা স্পাইক লি

কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৩তম আসরের মূল প্রতিযোগিতার বিভাগে বিচারকদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন আমেরিকান পরিচালক স্পাইক লি। কিন্তু করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে গত বছর তা হয়নি। তবে ৭৪তম কান উৎসবে বিচারকদের নেতা থাকছেন তিনিই। এবারই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ কোনও পরিচালককে কানের মূল বিচারকদের সভাপতির আসনে দেখা যাবে। তাই তার নাম ঢুকে গেলো ইতিহাসের পাতায়।

মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত ছবিগুলোর মধ্যে কোনটি স্বর্ণ পাম জিতবে সেই গুরুদায়িত্ব থাকছে ৬২ বছর বয়সী এই নির্মাতার কাঁধে। তিনিই তুলে দেবেন সম্মানজনক পুরস্কারটি। মঙ্গলবার (১৬ মার্চ) আয়োজকদের পাঠানো ই-মেইলে এসব তথ্য জানা যায়।

সাধারণত মে মাসে কান উৎসব হয়ে থাকে। কিন্তু মহামারির কারণে আয়োজকরা দুই মাস পর রেখেছে এবারের আসর।  আগামী ৬ জুলাই শুরু হয়ে ৭৪তম কান উৎসব চলবে ১৭ জুলাই পর্যন্ত।  

কান উৎসবের সভাপতি পিয়েরে লেসকিউর বলেন, ‘অনিশ্চয়তায় ভরা কয়েকটা মাস কেটেছে আমাদের সবার। তবে স্পাইক লি আমাদের অবিরাম উৎসাহ জুগিয়েছেন। তার সমর্থন অবশেষে ফলপ্রসূ হতে যাচ্ছে।’

উৎসবের জেনারেল ডেলিগেট থিয়েরি ফ্রেমোর কথায়, ‘সিনেমার জন্য স্পাইক লি’র উৎসাহ আর আবেগ ফের সবার প্রতীক্ষিত উৎসবটি আয়োজনে আমাদের দারুণভাবে স্পৃহা দিয়েছে। এবারের পার্টি চমকপ্রদ হবে। আমাদের আর তর সইছে না!’

স্পাইক লি’র নেতৃত্বে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে কাজ করবেন আরও কয়েকজন বিচারক। তাদের নাম এবং অফিসিয়াল সিলেকশন আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে। শিল্প ও সৃজনশীলতাকে উদযাপন করতে দক্ষিণ ফরাসি উপকূলে এখন পুরোদমে প্রস্তুতি চলছে।

কানের সঙ্গে সম্পর্ক

২০১৯ সালের কান উৎসবের লালগালিচায় দুই হাতের আঙুলে ‘লাভ’ (ভালোবাসা) ও ‘হেট’ (ঘৃণা) শব্দ লেখা আংটি পরে হাজির হয়ে আলোচনার জন্ম দেন স্পাইক লি। তার কাজে ও চলাফেরায় যেন চিরন্তন কিশোরের প্রতিফলন পাওয়া যায়। স্নিকার ও ক্যাপ ছাড়া কখনও তাকে দেখা যায়নি জনসমক্ষে।  

১৯৮৬ সালে কান উৎসবের প্যারালাল বিভাগ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে স্পাইক লি’র প্রথম ছবি “শি’জ গটা হ্যাভ ইট’’ ইয়ুথ প্রাইজ জেতে। এরপর ১৯৮৯ সালে মূল প্রতিযোগিতায় স্থান করে নেয় তার ‘ডু দ্য রাইট থিং’। ১৯৯১ সালে ‘জঙ্গল ফিভার’ ছবির মাধ্যমে আবারও প্রতিযোগিতা বিভাগে ফেরেন তিনি। আউট অব কম্পিটিশন বিভাগে ১৯৯৬ সালে দেখা গেছে ‘গার্ল সিক্স’। ১৯৯৯ সালে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে ছিল তার ‘সামার অব স্যাম’। ২০০২ সালে তার ‘টেন মিনিটস ওল্ডার’ জায়গা পায় আঁ সাঁর্তে রিগারে। সব মিলিয়ে পাঁচবার কানের অফিসিয়াল সিলেকশনে স্থান করে নিয়েছে তার কাজ।

২২ বছর পর ২০১৮ সালে ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’ ছবির মাধ্যমে কান উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে ফেরেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিন নিবাসী স্পাইক লি। বুড়িয়ে গেলেও ক্যামেরার পেছনে তেজ ও শৈল্পিক মনোভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে চলেছেন তিনি। দারুণ রসবোধ, গোয়েন্দাধর্মী থ্রিলার ও রাজনৈতিক আবহে সাজানো ছবিটি কানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার গ্রাঁ প্রিঁ পেয়েছে।

এরপর চিত্রনাট্যকার হিসেবে প্রথমবার অস্কার জেতেন তিনি। ১৯৮৯ সালে ‘ডু দ্য রাইট থিং’ ছবির জন্য সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যকার বিভাগে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল তাকে। তবে ওইবার পুরস্কার জোটেনি কপালে। অবশেষে ৯১তম আসরে অস্কারের সোনালি মূর্তি পান তিনি। এর আগে ২০১৫ সালে সম্মানসূচক অস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে।

একনজরে স্পাইক লি

স্পাইক লি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, সম্পাদক ও প্রযোজক। চার দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য ছবি বানিয়েছেন তিনি, সময়ের সঙ্গে সেগুলো পেয়েছে ধ্রুপদী মর্যাদা। সিনেমায় নানান প্রশ্ন ও বিতর্কিত বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। জনসাধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের একের পর এক ছবিতে যৌক্তিকতার সঙ্গে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রতিটি কাজকে বলা যায় কৃষ্ণাঙ্গদের চিরকালের দুঃখ, যন্ত্রণা আর তাদের প্রতি বৈষম্যের কাব্য।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্যের আটলান্টায় ১৯৫৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন স্পাইক লি। বেড়ে উঠেছেন নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে। প্রকৃত নাম শেলটন জ্যাকসন লি। শুরুতে লেখালেখিকে গুরুত্ব দিতেন। নিজের সব চিত্রনাট্য নিজেই লিখতেন।  আমেরিকান সিনেমার মুক্তমনা মানুষটি শুরু থেকেই নিজের প্রতিটি ছবিতে জোরালো ও সাহসী বিষয়, ক্ষুরধার পরিচালনা, বলিষ্ঠ সংলাপ, ছন্দময় দক্ষতা ও জুতসই গানের সম্মিলন ঘটিয়েছেন।

স্পাইক লি’র ছবির তালিকায় আরও উল্লেখযোগ্য– ‘ম্যালকম এক্স’ (১৯৯২), ‘গেট অন দ্য বাস’ (১৯৯৬), ‘হি গট গেম’ (১৯৯৮), ‘দ্য ভেরি ব্ল্যাক শো’ (২০০০), ‘শি হেট মি’ (২০০৪), ‘ইনসাইড ম্যান’ (২০০৬), প্রামাণ্যচিত্র ‘ফোর লিটল গার্লস’, ‘হোয়েন দ্য লেভিস ব্রোক: অ্যা রিক্যুইয়েম ইন ফোর অ্যাক্টস’ (২০০৪)।

পথিকৃত হিসেবে নতুন প্রজন্মের আফ্রিকান-আমেরিকান পরিচালকদের জন্য পথ সুগম করে দিয়েছেন স্পাইক লি। যেমন- রায়ান ‍কুগলার (ব্ল্যাক প্যান্থার), জর্ডান পিলে (গেট আউট), ব্যারি জেনকিন্স (মুনলাইট), অ্যাভা ডুভারনে (সেলমা)। 

ইত্তেফাক/এসজেড