বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে ১৯৭৮ সাল থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও ঢাকায় মালদ্বীপ দূতাবাস স্থাপন করে ২০০৮ সালে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দুই দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দুই দেশই দক্ষিণ এশিয়ার সংস্থা সার্কের সদস্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচ মুসলিম দেশের জোটের প্রস্তাবিত সদস্য মালদ্বীপ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হয়ে এসেছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ।
মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের ক্ষুদ্র একটি দ্বীপরাষ্ট্র। কিন্তু গত এক দশকে দেশটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। মালদ্বীপের বর্তমান প্রবৃদ্ধি ৬%। দেশটির মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ডলারে। মালদ্বীপের মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ৩০ হাজার। অভিবাসী রয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজারের মতো যার মধ্যে ৭০% অভিবাসীই বাংলাদেশি। তবে অবৈধভাবে থাকা আরো ৪০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসীকে বৈধ করার ঘোষণাও দিয়েছে মালদ্বীপ সরকার। এছাড়া ২০২০ সালে মালদ্বীপের অর্থায়নে ১০ হাজার অবৈধ শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হয়।
মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের মধ্যে ট্যুরিজম, ফিশারিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে সহযোগিতার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বিকাশ যাপনে প্রথম পছন্দ মালদ্বীপ। মুসলিম দেশ, অ্যালকোহলমুক্ত রেস্তোরাঁ ও ‘হালাল’ খাবারের জন্য মুসলিম নাগরিকরা পছন্দের তালিকায় রাখেন মালদ্বীপকে। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য মালদ্বীপ হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় জায়গা। তবে সরাসরি ঢাকা-মালে বিমান চলাচল না থাকায় মালদ্বীপ-বাংলাদেশ যোগাযোগটা ওভাবে হচ্ছে না। সম্প্রতি উভয় দেশই সরাসরি বিমান চলাচলের ওপর জোর দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি জাহাজ যোগাযোগও নেই। ফলে বাণিজ্যও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। মালদ্বীপের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ও মালদ্বীপের হিথাধু বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই যোগাযোগ স্থাপিত হলে দুই দেশের বাণিজ্যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। মালদ্বীপে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার চলছে। সে দেশের সমুদ্রবালি অবকাঠামো নির্মাণ বা ভরাট কাজে ব্যবহার অনুপযোগী। সে কারণে মালদ্বীপ বাংলাদেশ থেকে বালি, রড কিনতে চায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের পলিমাটি তারা তাদের কৃষি খাতে লাগাতে চায়। সেক্ষেত্রে সমুদ্রপথে সরাসরি যোগাযোগটা জরুরি। এছাড়া চট্টগ্রাম বিলাসবহুল রণতরীতে করে মালদ্বীপে পর্যটক নিয়ে যাওয়ার প্লান করছে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। ১৯২৭ কিলোমিটার সে সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে তিন দিন। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে মালদ্বীপ যেতে পর্যটকদের ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিমান ভাড়া দিতে হয়। রণতরী পরিকল্পনা দুই দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে অভাবনীয় দুয়ার খুলে দিবে।
সম্প্রতি মালদ্বীপের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। মালদ্বীপ সাক্ষরতায় এগিয়ে থাকলেও উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে আছে। মালদ্বীপের একমাত্র উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মালদ্বীপ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ শিক্ষা চুক্তি করে মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। এছাড়া পর্যটন নিয়ে পড়াশোনায় দুই দেশ অংশীদারিত্বে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশে সমুদ্র পর্যটনের বিকাশে মালদ্বীপের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। মালদ্বীপের শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় বৃত্তির ব্যবস্থা করলে সম্পর্ক স্কলার পর্যায়ে সমৃদ্ধ হবে। সমুদ্র অর্থনীতি ও মত্স্য আহরণে দুই দেশ অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারে। বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয়ের পর সমুদ্র অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে দেশে। এছাড়া ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটিতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলায় দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে সমর্থন করে মালদ্বীপ। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের বিশ্বস্ততা প্রমাণিত।
দ্রুত বর্ধনশীল অবকাঠামো খাত, হাসপাতাল নির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অথবা হোটেল ব্যবসায় নজর দিতে পারে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। যেহেতু ইতিমধ্যে শ্রমবাজার বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বাড়তি সুবিধা তো পাবেই। এছাড়া মালদ্বীপের মুসলিম সংস্কৃতি ও ঘুরতে আসা মুসলিম পর্যটকদের মূল্যবোধ বাংলাদেশিদের সেখানে সফল হতে বাড়তি প্রেরণা যোগাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাউথ এশিয়ান (সার্ক) বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি