বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন শুরু

বঙ্গবন্ধুর আদর্শে চলতে হবে :রাষ্ট্রপতি

বর্ণিল আয়োজনে ইতিহাসের দুই মাহেন্দ্রক্ষণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উত্সব উদ্যাপন শুরু করেছে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে শিশুদের কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ১০ দিনের আয়োজনের সূচনা হয়। এরপর রাত ৮টা পর্যন্ত চলে বর্ণাঢ্য নানা আয়োজন।  উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দুয়ারে দাঁড়ানো বাংলাদেশে রাজনীতির গতিধারা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে রাজনীতিবিদদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ফেরার এবং দেশের কাজে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। উদ্যাপনের সূচনায় জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, এখন শুধু আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। পেছনে ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই। সকল বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এ দেশকে আমরা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণ-বঞ্চনামুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবই, ইনশাআল্লাহ। এটাই আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা।

বাঙালির ইতিহাসের অনন্য এই উদ্যাপনের মুহূর্তে সঙ্গী হন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ এবং ফার্স্ট লেডি ফাজনা আহমেদ। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানা, রাষ্ট্রপতির স্ত্রী রাশিদা খানম এবং স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।  করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে গত এক বছর থমকে গিয়েছিল সব আয়োজন; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর উদ্যাপন গত এক বছর ধরে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল, তার মাঝেই বাঙালির জীবনে এলো উদ্যাপনের আরেক মাহেন্দ্রক্ষণ, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। জাতীয় পর্যায়ে ১০ দিনের অনুষ্ঠানমালা শেষ হবে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দিনে।

গতকালের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘আজ আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করছি। এ সময়ে রাজনীতিতে অনেক চড়াই-উত্রাই ঘটেছে। কিন্তু রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে তা ভেবে দেখতে হবে। ব্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশ বড়—এটাই হচ্ছে রাজনীতির মূল আদর্শ। কিন্তু আজকাল যেন রাজনীতি উলটো পথে হাঁটছে। কিছু সুবিধাবাদী লোক রাজনীতিটাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছেন।’ আবদুল হামিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মবার্ষিকীর এই দিনে তাই আমি রাজনীতিবিদদের আহ্বান জানাব, আসুন বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত করি।’

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি যে সক্রিয়, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের প্রতিহত করে দেশকে এগিয়ে নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তি এখনো দেশে-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে। তারা নানা অপতত্পরতার মাধ্যমে এ অর্জনকে নস্যাত্ করতে চায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের শুভ জন্মদিনে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সকল অপতত্পরতা প্রতিহত করে প্রিয় মাতৃভূমিকে উন্নয়ন-অগ্রগতির পথ ধরে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাই।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক্ষার প্রহরের আজ অবসান হতে চলেছে। আজ এমন এক সময়ে আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করতে যাচ্ছি, যখন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মর্যাদাশীল উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে’। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১৭ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত আমরা দেশে এবং বিদেশে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আজ তার সূচনাপর্ব। তবে আমাদের উত্সব ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতে থাকবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ভ্রাতৃপ্রতীম দেশটির জনগণকে শুভেচ্ছা জানান শেখ হাসিনা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দেশবাসীর পক্ষ হতে তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’ চীন, কানাডা এবং জাপানের জনগণকেও শুভেচ্ছা জানান শেখ হাসিনা। পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের প্রতিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে জাতির পিতার সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরে বলেন, ১৯২০ সালের ১৭ মার্চের এই দিনে তার বাবা টুঙ্গীপাড়ায় জন্ম নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশ গড়তে জাতির পিতার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং যুদ্ধপরবর্তী দেশ গড়ার কাজে যেসব বন্ধুপ্রতিম দেশ এবং নেতা বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় কমিটি বাস্তবায়ন কমিটির এই আয়োজনে জাতীয় সংগীতের পর সংগীত পরিবেশনা ছিল শত শিশুশিল্পীর কণ্ঠে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার এই থিমে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড এলাকায় গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরার পাশাপাশি উন্নয়নের নানা দিকও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১০ দিনের এই আয়োজনে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি সামনে আনা হবে গত ৫০ বছরের ‘স্বপ্নযাত্রার’ গল্প। ১০ দিনের আয়োজনের প্রথম দিন ‘ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়’ থিমের ওপর ভিত্তি করে সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। শিশুকণ্ঠে সংগীতের পর মুজিববর্ষের থিম সংয়ের মিউজিক ভিডিও প্রদর্শন হয়। তারপর ছিল বিমানবাহিনীর ফ্লাই পাস্টের রেকর্ড করা ভিডিও প্রচার। এরপর স্বাগত সম্ভাষণ জানান জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইউশিহিদে সুগার ধারণ করা ভিডিও বার্তা। ‘সম্মানিত অতিথি’ মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহর বক্তব্যের পর প্রধান অতিথির ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা পর্ব শেষ হয়।

দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক আয়োজনে দেশীয় শিল্পীদের পাশাপাশি একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে ভারতের শিল্পীদের পরিবেশনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্বে ‘ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়’ থিমের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত অডিও-ভিজ্যুয়ালে ফুটে উঠে জাতির পিতার সংগ্রামী জীবনের নানা অধ্যায়। অর্কেস্ট্রা মিউজিকের সঙ্গে গান পরিবেশনা, বঙ্গবন্ধুকে প্রতীকী চিঠি উত্সর্গ, ‘মুজিব শতবর্ষের কার্যক্রম ফিরে দেখা’ শীর্ষক ভিডিও দেখানো হয় এ সময়। এ পর্বে পরিবেশিত হয় বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সব গান। সংগীত পরিবেশন করেন সাদি মোহাম্মদ, রফিকুল আলম, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, শিমূল ইউসূফ।

বঙ্গবন্ধুকে উত্সর্গ করে বন্ধু রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ছিল ভারতের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মমতা শঙ্করের নেতৃত্বে একটি বিশেষ পরিবেশনা। বর্ণিল আতশবাজি ও লেজার শোর মাধ্যমে রাত ৮টায় শেষ হয় প্রথম দিনের আয়োজন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, দেশি-বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থা প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।