ফিরে দেখা

প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস

১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সংঘটিত হয় প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। তখন ভাওয়াল রাজবাড়িতে ছিল দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনানিবাস। এ রেজিমেন্টে ২৫-৩০ জন পাঞ্জাবি সৈন্য ছাড়া সবাই ছিলেন বাঙালি। এখানকার বাঙালি সৈন্যরা জানতে পারেন পাকিস্তানি বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে এখানে আসছে। ১৯ মার্চ দুপুরের দিকে জয়দেবপুর সেনানিবাসে জাহানজেব উপস্থিত। বাঙালি সৈন্যদের পাঞ্জাবিরা নিরস্ত্র করতে এসেছে—এ খবর দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালি সৈন্যরা, স্থানীয় জনতা ও বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক তাদের মতলব বুঝতে পারে। ঐদিন হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল গাজীপুরের দামাল সন্তানেরা। খবর পেয়ে হাজার হাজার উত্তেজিত জনতা জয়দেবপুর বাজারে সমবেত হয়। তারা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সশস্ত্র প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে জয়দেবপুর ও ঢাকার মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র সড়কের অনেক স্থানে জয়দেবপুর থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত গাছের গুঁড়ি, রেলগাড়ির বগি, ইট, বাঁশ ইত্যাদি ফেলে বিশাল ব্যারিকেড তৈরি করে। এই প্রতিরোধে জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদের সমর্থন ছিল।

প্রতিরোধের জন্য স্থানীয় অনেকের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা, তীর-ধনুক, দা ও বল্লম। সেনানিবাসে জাহানজেবের কাছে সে খবর পৌঁছে যায়। ঢাকা ফেরার পথে জাহানজেব চান্দনার কাছে পৌঁছালে পাকবাহিনী প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে। বদমেজাজি জাহানজেব জনগণের ওপর গুলির নির্দেশ দেয়। কিন্তু বাঙালি সৈন্যরা গুলি করতে অস্বীকার করেন। অন্যদিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলিবর্ষণ শুরু করলে জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। উত্তেজিত জনতা সৈন্যদের গাড়ির চাকা নষ্ট করে দেয় এবং কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে। কাজী আজিম উদ্দিন ও দুজন ব্যক্তি পাকিস্তানি সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। বীর জনতা কেড়ে আনা  চায়নিজ রাইফেল দিয়েও গুলি ছুড়তে থাকে।  হুরমত নামের এক সাহসী যুবক পাঞ্জাবি সৈন্যকে জাপটে ধরে তার রাইফেল ছিনিয়ে নেন। কিন্তু অন্য এক পাকিস্তানি সৈন্যের গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলেই শহিদ হন। পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্বিচারে গুলিবর্ষণে শহিদ হন আরো ২০ জন। আহত হন শত শত বীর বাঙালি। সম্মুখযুদ্ধের পর কারফিউ জারি করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জয়দেবপুরের এক বাজারে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র নাগরিকের ওপর হামলা চালায় কিভাবে? তোমরা আর কত রক্ত চাও?’

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ১৯ মার্চ এই সশস্ত্র প্রতিরোধের ঘটনায় অনুপ্রেরণা, সাহস ও শক্তি পায় বাঙালিরা। সারা দেশে মানুষের মুখে তখন এক স্লোগান— ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ১৯ মার্চের এই সশস্ত্র গণবিদ্রোহের খবর প্রকাশিত হয়। জয়দেবপুর চৌরাস্তার মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ ১৯ মার্চের প্রতীক।