সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকলে এর উত্তর পাশে চোখে পড়ে শিখা চিরন্তনী আর দক্ষিণ পাশে টেরাকোটায় আচ্ছাদিত একটি অনতি উচ্চ চাতাল। চাতালের ভেতরে রয়েছে ‘স্বাধীনতা জাদুঘর।’ সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাতালের পাশের গ্লাস টাওয়ারটি, রাতের বেলা যা নিজে আলোকিত হয়ে চারপাশকেও আলোকিত করে রাখে। এই গ্লাস টাওয়ারটিই ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ বলে পরিচিত সবার কাছে। চাতালের পশ্চিমে আছে একটি কৃত্রিম জলাধার। জলাধারটি অসংখ্য সাদা কালো পাথর আর ছোট ছোট মাছে ভরা। স্বাধীনতা স্তম্ভের এই চমত্কার নকশাটি করেছেন স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী ও মেরিনা তাবাসসুম। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই এই নির্মাণশিল্প।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানের মাঠে দীপ্ত পায়ে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেছিলেন। বর্তমানে যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বলে পরিচিত। ৭ মার্চের সকালটা ছিল অন্যরকম এক সকাল। আপামর বাঙালি জনসাধারণ তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার মুখ থেকে স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা পেতে ওইদিন সকাল থেকে যে যেখান থেকে পেরেছে একে একে জড়ো হতে লাগল। দেখতে দেখতে রেসকোর্স ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হলো। মানুষের চোখে মুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল—কী বলেন তাদের পথ প্রদর্শক! প্রিয় নেতা! বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিট স্থায়ী এই ভাষণটিই পরে হয়ে গেল একটি আলাদা কালপর্বের ইতিহাস। স্বাধীনতার সোনালি বীজ এই ভাষণের মধ্যেই বোনা হয়ে গিয়েছিল সেদিন। এই ভাষণটির শক্তি এমন ছিল যে—কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা যেন মুহূর্তে ঝলকে উঠেছিল সেদিন! নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এই ভাষণটি টনিকের মতো কাজ করতে লাগল। পাকিস্তানি জান্তার জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখার কারণে বাঙালির ঘুম চলে গিয়েছিল একেবারে। শান্তিও উধাও। আর সবচেয়ে বেশি হয়েছিল পরাধীন থাকার বেদনা, কারণ নিজের প্রিয় স্বদেশ পাকিস্তানিদের কাছে জিম্মি থাকলে কোন বাঙালি ভালো থাকে? পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়াল—সবাই তখন ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি তীব্র শীতের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা হয়ে জ্বলে উঠল যেন! জেনারেল ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে দাঁতভাঙা জবাবও ছিল এ ভাষণ! ৭ মার্চের ভাষণকে বানচাল করার জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেও পারেনি বঙ্গবন্ধুকে থামাতে। বঙ্গবন্ধুকে যেন কোনো ভয়ই সেদিন স্পর্শ করতে পারেনি। বুকের সমস্ত তেজ ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি ওইদিনের জ্বালাময়ী ভাষণে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আজও তার নীরব সাক্ষী। ‘২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্তদানের করুণ ইতিহাস’ অথবা ‘বাঙালি-অবাঙালি, হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের ভাই, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।’ বা ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ ভাষণের শেষ লাইন ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বারুদে ঠাসা এমন এক-একটি বাক্য আজ এক-একটি প্রবাদ। এই ভাষণটিকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারেও এই ভাষণটি তালিকাভুক্ত। এটাই বাংলাদেশের প্রথম কোনো দলিল যা স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত।