ঝর্না রহমানের জন্ম ১৯৫৯ সালে। প্রধানত কথাসাহিত্যিক। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, নাটক, কবিতা, ছড়া, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্য, সংগীত—সবক্ষেত্রেই তাঁর কমবেশি বিচরণ। তাঁর সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি বিশদ বিবরণের ভেতর দিয়ে সমাজ ও ব্যক্তিমানসের নানা সংকট উন্মোচন করেন। তাঁর আখ্যানরীতি এবং বর্ণনাশৈলী যেমন স্বতন্ত্র তেমনই আকর্ষণীয়। নারী পুরুষের সম্পর্ক, নারীজীবনের অন্তর্গত বেদনা তাঁর সাহিত্যের প্রিয় প্রসঙ্গ হলেও তিনি দেশজ এবং সামাজিক প্রায় প্রতিটি অনুষঙ্গকে তাঁর সাহিত্যের বিষয় করে তুলেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৬০টির মতো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ঝর্না রহমান বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে সম্প্রতি অবসরে গেছেন। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোজাফ্ফর হোসেন
আপনি কথাসাহিত্যে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২৭ পেলেন। আপনাকে অভিনন্দন জানাই। লেখালেখির অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এ পর্যায়ে এসে এই প্রাপ্তিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
যে কোনো কাজের জন্য পুরস্কার মানে হচ্ছে স্বীকৃতি। সাহিত্যক্ষেত্রে পাক্ষিক অনন্যা ছাব্বিশ বছর যাবত্ প্রতি বছর একজন সাহিত্যিককে পুরস্কার প্রদান করে আসছে। এ পুরস্কার খুবই সুনির্বাচিত এবং যথাযোগ্য ব্যক্তিকে দেওয়া হয়। কাজেই এ পুরস্কারপ্রাপ্তিকে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব ও সম্মানের চোখে দেখি। আর অনেক পথ পাড়ি না দিলে হয়তো নিজেকে তৈরি করা হয় না। পুরস্কার তো একজন মানুষের কাজকেই মূল্যায়ন করে। কাজের পথ দীর্ঘ হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
লিখতে শুরু করেছিলেন আশির শুরুতে। এরপর একে একে প্রায় ৬০টি গ্রন্থ হয়ে গেল। এই পরিভ্রমণটা কতটা উপভোগ্য, কতটা কষ্টকর ছিল?
সৃজনশীল কাজে কষ্ট আর উপভোগের আনন্দ পাশাপাশি চলে। তবে লেখালেখির ক্ষেত্রে একজন লেখকের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক পরিবেশ, স্থানকাল অনেকখানি প্রভাব ফেলে। আমার ক্ষেত্রে এসব খুব অনুকূল ছিল না। জীবনের সহস্র দায়িত্বকর্তব্য পালনের পাশাপাশি চলেছে লেখা। জীবনচলার গতি ঠিক রাখতে গিয়ে অনেক সময় লেখার গতি স্তিমিত হয়েছে। কিন্তু তার পরেও চল্লিশ বছরের পরিসরে ৫০টিরও বেশি বই লিখেছি। এসব বইয়ে জীবনের বিচিত্র দিক, মানবমনের শতরঙের আবেগ-অনুভূতির কথা বলতে চেয়েছি। সময়ের সাথে সাথে নানারকম পরিবর্তন যুক্ত হতে দেখেছি জীবনে। একজন লেখক তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে এই সময়কে পরিভ্রমণ করেন। জীবনের পরিবর্তনগুলোকে সাহিত্যের অঙ্গীভূত করে এগিয়ে চলেন। এই যাত্রা তাঁর জন্য উপভোগ্য তো বটেই।
শিল্পসাহিত্যের প্রায় শাখাতেই আপনার আগ্রহ ও নিবেদন আমরা দেখি। আপনি সমগ্র শিল্পকে মেলান কীভাবে?
আমার সমস্ত সত্তাই শিল্পের কাছে নতজানু। অতি সাধারণ, সামান্য কাজকেও নিপুণভাবে শৈল্পিক সুষমা দিয়ে করতে আমার ভালো লাগে। সাহিত্যের প্রতিটি শাখার সৃজনকলা আমাকে আকর্ষণ করে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, গান, সুর, চিত্র, ভাস্কর্য সব কিছুর ভেতরে যে শিল্পময়তা আছে তা আমাকে আনন্দ দেয়, উদ্দীপ্ত করে। জীবনের গল্পগুলো, জীবননাট্যের নানা দৃশ্য, দুঃখবেদনা প্রেমভালোবাসার গভীর গহন অনুভূতি, রোমান্টিক স্বপ্নকল্পনা সবই আমাকে উদ্বুদ্ধ করে লিখতে।
আপনার গল্প-উপন্যাসে চমত্কার ডিটেলিং থাকে। আখ্যানে আপনি খুব মনোযোগী। ভাষার ক্ষেত্রেও ভীষণ সচেতন। এক্ষেত্রে আপনি নিজেকে তৈরি করেছেন কীভাবে?
ডিটেলিং, আখ্যান, ভাষা—কথাসাহিত্যে এই তিনটি জিনিসই খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার লেখায় এই তিন বিষয়েই যত্ন ও মনোযোগ থাকে। গল্প-উপন্যাসের আখ্যান নির্মাণের পেছনে থাকে লেখকের জীবনাভিজ্ঞতা, জীবনবোধ, জীবনদর্শন। শৈশব থেকেই আমার জীবন প্রচণ্ড সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গেছে। অল্প বয়সে বিয়ে, সন্তান, সংসার সব কিছুর ভেতর দিয়ে লেখাপড়া, চাকরি, পিতৃগৃহে শ্বশুরালয়ে বড়ো পরিবারের বড়ো মেয়ে বা পুত্রবধূর দায়িত্ব—অজস্র যাপনার ভেতর দিয়ে জীবন আমাকে শতসহস্র অভিজ্ঞতার রশ্মি বিতরণ করেছে। অন্তর্দৃষ্টি আর পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত প্রখর করে চলি আমি। বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুকে দেখতে না পেলে সাহিত্যে জীবন ফলিয়ে তোলা যায় না। মানবচরিত্র বিশ্লেষণ-ক্ষমতাও থাকতে হবে। ডিটেলিং আখ্যানকে বিশেষ রূপ দেয়। একটি দৃশ্য বা ঘটনার ভেতর গভীরতর আরও দৃশ্য, ঘটনা বা অনুভূতির ব্যঞ্জনা থাকে। সূক্ষ্ম ডিটেলিং পাঠককে সেই সত্য আর অনন্য অনুভূতির সন্ধান দিতে পারে।
আপনি আশির দশক থেকে যে বাংলাদেশ, যে মানুষের গল্প বলে আসছেন, সেই দেশ সেই মানুষের জীবন নিয়ত বদলে গেছে। এই পরিবর্তন ধরতে আপনাকে সচেতনভাবে নিজের লেখার স্টাইলে কি কোনো পরিবর্তন আনতে হয়েছে?
জীবনের গল্প বলাই কথাসাহিত্যিকের কাজ। সময়ের সাথে সাথে জীবন বদলে যায়, লেখক যদি সেই পরিবর্তনকে তাঁর লেখায় ধরতে না পারেন, তাহলে তাঁর সাহিত্য স্থবিরতায় আক্রান্ত হবে, কক্ষচ্যুত উল্কার মতো ছাই হয়ে ঝরেও পড়তে পারে। আমরা পাঠ শুরু করেছিলাম স্লেট পেনসিলে অ-আ-ক-খ লিখে। সে জীবন এখন ডিজিটাল পর্দায় এসে এক লহমায় সারা বিশ্বকে যুক্ত করে নিচ্ছে। লেখার জন্য এখন কাগজ-কলম লাগে না, এমনকি, কি-বোর্ডের চাবিও স্পর্শ করতে হয় না। উচ্চারণ করলেই লেখা হয়ে যাবে। শিগগিরই হয়তো থট-রাইটিং প্রযুক্তিও এসে যাবে। সময়ের সাথে বদলে যাচ্ছে মানুষের আচরণ সংস্কৃতি রাজনীতি পেশা খাদ্য ও পোশাক-রুচি, চিন্তাভাবনা, জীবনদর্শন সবকিছুই। এই পরিবর্তনকে সাহিত্যে ধরতে হলে স্টাইল বা রীতিও বদলাতে হবে বৈকি!
নারী লেখকদের নানা সীমাবদ্ধতার কথা পুরুষ সমালোচকরা বলেন। তার মধ্যে কমন অভিযোগ হলো—নারীর গদ্য মেয়েলি, নারীর কবিতা আবেগ দ্বারা আক্রান্ত, নারীর লেখায় যৌনতা ও রাজনৈতিক উপকরণ কম, এইসব। আপনি এ ধরনের একপেশে সমালোচনাকে কীভাবে দেখেন?
শক্তিমান লেখক হতে হলে সাধারণ বিদ্যাশিক্ষা ছাড়াও কয়েকটি মূল জিনিস তাঁর মধ্যে থাকতেই হবে। তার মধ্যে অন্যতম হলো জীবনাভিজ্ঞতা। তারপরে আছে ভাষাজ্ঞান, সাহিত্যপাঠ, উচ্চমানের কল্পনাশক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কিত জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি—এসবই একজন লেখককে সমৃদ্ধ করে। এখন এসব বিষয় যদি একজন নারী লেখক আয়ত্ত করতে পারেন তবে তাঁর লেখা ভালো হবে, গদ্য বলিষ্ঠ হবে।
মেয়েদের লেখা হলেই তাকে ‘মেয়েলি’ বলাটা সত্যিই একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমালোচনা সাধারণ তো বটেই, লঘুও! নারীদের লেখায় সংসার সন্তান রান্নাঘর খাওয়ার ঘরের গল্প এলে তা দেখে ভ্রু কুঁচকানোর কিছু নেই! সেসব জীবনেরই গল্প। বরঞ্চ, গার্হস্থ্য জীবন, মাতৃত্ব, দাম্পত্য, যৌনতা এসব নিয়ে নারী লেখকের অভিজ্ঞতা যতখানি নিবিড় ও জীবনঘনিষ্ঠ হবে, পুরুষ লেখকের তা হবে না। বিষয় যা-ই হোক, দেখতে হবে সে লেখার ভাষা কেমন, উপস্থাপন কেমন, জীবনবোধ কল্পনাশক্তি আর নির্মাণশৈলী কেমন। সে-সব যাঁর ভালো, তিনি ভালো লেখক। তিনি নারী পুরুষ যে-ই হোন না কেন।
বহু পুরুষ লেখক আছেন, এমন কি স্বনামধন্য পুরুষ লেখকও আছেন, যাঁদের লেখা দুর্বল। ভাষা জানেন না, বানান জানেন না, শব্দ ব্যবহার জানেন না, বাক্যগঠন ভুল, উপমা-উেপ্রক্ষা-তুলনা-রূপকে গলদ। কল্পনা আর চিন্তাশক্তির কথা না-ই বা বললাম। কিন্তু তাঁদের লেখাকে কেউ ‘পুরুষালি’ বলবে না। কারণ ‘পুরুষালি’ ইতিবাচক শব্দ! বরঞ্চ সমালোচনা করতে হলে তাঁদের লেখাকেও মেয়েলি বলা হবে! এটা একটা অদ্ভুত ব্যাকরণ! যা কিছু মেয়েদের সাথে যুক্ত তা-ই দুর্বল!
রাজনৈতিক উপকরণের কথা বলতে গেলে সেখানেও অভিজ্ঞতা, জ্ঞানার্জন ইত্যাদি প্রসঙ্গ আসে। গণ্ডিবদ্ধ জীবন, সীমিত পাঠ, রাষ্ট্র সমাজ ইতিহাস অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তা, ধারণা, বোধ ও দর্শনের অভাবের কারণে অনেক নারী লেখকের লেখায় রাজনৈতিক উপকরণেরও অভাব থাকতে পারে। সেটা পুরুষ লেখকের লেখায়ও থাকতে পারে। যে কেউ লেখালেখি করতে পারেন, কিন্তু সবাই শক্তিমান লেখক হবেন এমনটা ভাবা বাতুলতা। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েরা ভালো লিখলেও তার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অনেক লড়াই করতে হয়। এমনকি অনেক নারী লেখক আছেন যাঁরা হয়তো অনেক বিখ্যাত পুরুষ লেখকের চেয়ে ভালো লেখেন, কিন্তু তাঁর হয়তো তেমন প্রসার ঘটে না। যেমন ঠাকুর বাড়ির মেয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী অনেক মেধাবী লেখক হয়েও পুরুষ লেখক রবিকে ছাড়িয়ে নিজের স্বর্ণপ্রভা ছড়াতে পারেননি।
নারীর সাহিত্যে যৌনতা কম—এমন কথা কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভাববার বিষয়। সাহিত্যে যৌনতা মাপার কোনো ব্যারোমিটার আছে কি না আমার জানা নেই। যৌনজীবন মানবজীবনের একটা অন্যতম দিক। সাহিত্যে যে জীবন অঙ্কিত হবে, যে চরিত্র নির্মিত হবে, সে জীবনকাহিনি ও চরিত্র সৃজনের প্রয়োজনে যৌনতাও আসবে, অথবা আসবে না। গল্প-উপন্যাসকে যৌনগন্ধী করে তোলা বা কামরঙে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য দৃশ্য নির্মাণে, সংলাপে, চরিত্র চিত্রণে আদি রসের ভিয়েন দেওয়াকে অনেকে ‘সাহসী’ আর ‘জীবনঘনিষ্ঠ’ লেখা বলে গণ্য করেন। এরকম সাহসী হওয়ার জন্য অনেক নারী লেখকও আছেন অপ্রয়োজনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গল্পে যৌনতার পরিচর্যা করেন। আরোপিত যৌনতা গল্পকে রসালো করে তুলতে পারে, নান্দনিকতাকে স্পর্শ করতে পারে না।
এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে আপনার দুটি বই ‘জলপরী ও নূহের নৌকা’ এবং ‘কাকজোছনা’। এ দুটি বই সম্পর্কে আমাদের যদি কিছু ধারণা দেন...
‘জলপরী ও নূহের নৌকা’ একটি গল্পগ্রন্থ। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের দশটি গল্প নিয়ে এ সংকলন। নাম গল্পটি জাদুবাস্তবতার মিশেলে নদী বা জলের আর্তনাদের গল্প। ‘কাকজোছনা’ একটি উপন্যাস। এ বইয়ের বিষয় বয়ঃসন্ধিকালীন এক কিশোরীর মনোবীক্ষণ। এখানে রয়েছে সমাজ মানসের চিত্র। বর্তমান সময়ের হতাশ ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত তারুণ্যের মনঃস্তাত্ত্বিক পরিচর্যা এ উপন্যাসের আর একটি দিক।
আপনাকে ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ।