করোনা মহামারির বন্দিজীবন কাটিয়ে বই উত্সবে মেতে ওঠার উপলক্ষ্য এনে দিয়েছে বইমেলা। সামনের একটি মাস মানুষ বইয়ের আনন্দের মধ্যে থাকবে। অক্ষরের গন্ধে মেতে উঠবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠবে বইয়ের উদ্যান।
বইমেলা যে শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়াল, সেই আনন্দই মেলায় আসা দর্শকদের মাঝে, সবার মাঝেই। মেলা হবে নাকি হবে না—এ নিয়ে যে আশা-নিরাশার দোলাচল ছিল, সেটা কেটে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দুয়ার খুলল অমর একুশে বইমেলার। আঁধার নামতেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল স্বাধীনতাস্তম্ভ। ভাষাশহিদদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভের উজ্জ্বল আলো ভিন্ন দ্যোতনা ছড়িয়ে দিল বইমেলা প্রাঙ্গণে, মানুষের মনে। বাঙালির জীবনে আবারও ফিরে এলো নতুন বইয়ের গন্ধজড়ানো মাদকতাময় মাস। শুরু হলো বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২১’।
স্বাধীনতাস্তম্ভের তিন পাশে বিশাল এলাকা জুড়ে বইমেলার চৌহদ্দি। রঙে, আলোয় বর্ণিল হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যার পরে প্রচুর মানুষের আনাগোনা মেলা জমে ওঠার ইঙ্গিত দিল। যদিও মেলা এখন পর্যন্ত গুছিয়ে ওঠেনি। বেশির ভাগ স্টলেই রং করা, স্টলের কাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। বই সাজানো হয়নি অনেক স্টলেই। তার পরও বইমেলায় ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগছে।
করোনা মহামারির কারণে সারা বছর ধরেই ঘরে বসে রয়েছে প্রকাশক ও বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট সবাই। তাই পুস্তক প্রকাশনা জগতের সবারই প্রত্যাশা, যখন যেভাবেই হোক বইমেলা যেন হয়। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় বইমেলা করার সম্মতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই দেরিতে হোক, প্রাণের মেলা তো শুরু হলো! সেই আনন্দ পাঠক-প্রকাশক সবার মনেই।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বেশ হন্তদন্ত হয়ে প্যাভিলিয়নে গিয়ে স্টল গোছানোর তদারক করছিলেন। বললেন, প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণে আসেন বলে সব স্টল গোছানো হয়ে যায়। এ বছর তিনি ভার্চুয়ালি মেলার উদ্বোধন করেছেন, সে কারণে সব স্টল খানিক অগোছালো রয়ে গেছে। আশা করি, এক দিনেই সব গুছিয়ে উঠবে।
মেলার পরিসর গতবারের চেয়ে এবার প্রায় দ্বিগুণ। গত বছর মেলার পরিসর ছিল ৮ লাখ বর্গফুট। এবার করোনা মহামারির কথা ভেবে তা করা হয়েছে ১৫ লাখ বর্গফুট। তাই মেলায় গাদাগাদি ভিড় হবে না বলেই আশা করছে বইমেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষ। এ বছর পাঠক-প্রকাশকদের বহুদিনের দাবি মিটিয়েছে বাংলা একাডেমি। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের দিক থেকে নতুন প্রবশেপথ করা হয়েছে আর সেখানেই গাড়ি ও মোটরসাইকেল রাখার পার্কিং করা হয়েছে। ফলে, মেলায় স্বচ্ছন্দেই সবাই আসতে পারবেন।
যদিও মেলার বিন্যাস নিয়ে ক্ষোভ ঝরল আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গণির কণ্ঠে। তিনি বললেন, করোনার পরে প্রথম এত বিশাল কোনো সাংস্কৃতিক উত্সব হতে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা গোছালো হলো না। বইমেলা জুড়ে ধুলো, মাঠে ইটের টুকরা, নোংরা জমে রয়েছে। কিছুই সরানো হয়নি। স্টল বিন্যাসেও ছোট প্রকাশকদের অবহেলা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মেলা আয়োজনে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে।
করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এ বছর প্রথম সপ্তাহে শিশুপ্রহর ঘোষণা থেকে পিছিয়ে এসেছে বাংলা একাডেমি। পরবর্তী সময়ে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হবে। আজ শুক্রবার মেলা চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত, তবে মেলায় রাত সাড়ে ৮টার পর আর প্রবেশ করা যাবে না।
নতুন বই :প্রথম দিন বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ থেকে নতুন বই প্রকাশের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে কিছু নতুন বই প্রকাশের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অবসর থেকে প্রকাশ হয়েছে গোলাম মুরশিদের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক পটভূমি’, হায়াত্ মামুদের গল্পের বই ‘যাদুকরের ভেঁপু’, এ কে এম শাহনাওয়াজের ‘ভারতীয় সভ্যতা’, টাঙ্গুন থেকে এসেছে অ্যাডভোকেট জাকিয়া তাবাসসুম জুঁইয়ের ‘মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল’, অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে হারুন হাবীবের ‘কলকাতা ৭১’, হারুন-অর-রশীদের ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’, ইউপিএল এনেছে আনন্দ বিকাশ চাকমার ‘কার্পাস মহল থেকে শান্তিচুক্তি :পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নীতির ইতিহাস’, সময় প্রকাশন এনেছে লিখন অরণ্য ও সাইদ হাসান দারা অনূদিত গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘দ্য জেনারেল ইন হিজ ল্যাবারিন্থ’ প্রভৃতি।
আজকের অনুষ্ঠান :বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্বাধীনতার ‘সুবর্ণজয়ন্তী :বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সুভাষ সিংহ রায়। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন সংসদ সদস্য অ্যারোমা দত্ত ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।