চট্টগ্রাম ওয়াসায় ভর্তুকি বাড়ছে আর্থিক সংকটের আশঙ্কা

চট্টগ্রাম ওয়াসায় পানি সরবরাহে ভর্তুকি বাড়ছে। পানি শোধনাগারগুলোতে বিদ্যুতের বিল, কেমিক্যাল ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় পানির উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওয়াসায় বছরে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বিদ্যুত্ বিল বাবদ ব্যয় হচ্ছে। জনবলের সংকটে প্রতি মাসে পানি শোধনাগারগুলোতে ওভারটাইম বাবদ লাখ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি হাজার লিটারে ৬ টাকা হারে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন ৩৬ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে ওয়াসা। সেই হিসাবে ওয়াসাকে প্রচুর টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ওয়াসার ঘাড়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশি ঋণ রয়েছে। আগামী বছর থেকে দুটি প্রকল্পের বিদেশি ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ শুরু করতে হবে। এতে ওয়াসা তীব্র আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ওয়াসায় বড় আকারের তিনটি পানি শোধনাগার চালু রয়েছে। এই তিনটি শোধনাগার থেকে দৈনিক ৩২ কোটি লিটার পানি সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। আর বাকি ৩ কোটি লিটার গভীর নলকূপ থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, শোধনাগারগুলোর পেছনে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রাঙ্গানিয়ায় নির্মিত শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার থেকে নগরীতে দৈনিক ১৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। এসব পানি শোধন করতে গিয়ে প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। শুধু শেখ হাসিনা পানি শোধনাগারে বছরে দেড় কোটি টাকা বিদ্যুত্ বিল বাবদ খরচ হচ্ছে। আর ক্লোরিন বাবদ বছরে ৩৫ লাখ টাকা, চুনা বাবদ সাড়ে ৪ লাখ টাকা, ফিটকিরি বাবদ দেড় কোটি টাকা খরচ হয়ে থাকে। এছাড়া পানি শোধনাগারগুলোতে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এতে প্রকল্প পরিচালনায় ওভারটাইম বাবদ ব্যয় বেড়েছে। পানি শোধনাগারগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হয়। ফলে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মাসে ১১০ থেকে ১৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম করতে হচ্ছে।

ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘পানি শোধনাগারে ব্যবহূত দ্রব্যগুলো আমরা স্থানীয়ভাবে টেন্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করি। বিদ্যুত্ বিল ও পানি শোধনের কাজে ব্যবহূত প্রতিটি জিনিসেরই দাম বেড়েছে। তাই পানির উত্পাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। জনবলের সংকটে ওভারটাইম বাবদও প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে।’

অনুরূপভাবে মদুনাঘাট শেখ রাসেল পানি শোধনাগার ও মোহরা পানি শোধনাগারে একই ধরনের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এ দুটি শোধনাগারের প্রতিটি থেকে দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানি উত্পাদন করা হয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসায় ১৯৭৮ সালে মোহরা পানি শোধনাগারটি নির্মিত হয়। এরপর গত ২৫ বছরে দ্বিতীয় কোনো পানি শোধনাগার নির্মিত হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলে বৃহত্ দুটি পানি শোধনাগার নির্মাণের পর পানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে রাঙ্গুনিয়ায় নির্মিত আরেকটি পানি শোধনাগার উত্পাদনে যাচ্ছে। এটি থেকেও দৈনিক ১৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা যাবে।

ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ১ হাজার লিটার পানির উত্পাদন খরচ ১৬ টাকা। আর বিক্রি করছে ১০ টাকায়। কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ক্ষমতাবলে বছরে ৫ শতাংশ পানির বিল বাড়াতে পারে। পানির দাম না বাড়ালে ভর্তুকি বেড়ে যাবে। ব্যয় বাড়ালেও সরকার ওয়াসাকে ভর্তুকি দিতে নারাজ। মন্ত্রণালয় থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয়। আয় বাড়িয়ে ব্যয় নিরসন করতে হবে। আবার পানির দাম বাড়াতে গেলেও চরম জন-অসন্তোষ দেখা দেবে।

নগরবাসীর বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে চট্টগ্রাম ওয়াসা একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বিদেশি ঋণের অর্থায়নে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার ঘাড়ে এখন প্রায় ৫ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা বিদেশি ঋণের বোঝা। এর মধ্যে  দুটি প্রকল্পের ঋণের টাকা পরিশোধ ২০২২ সাল থেকে শুরু করতে হবে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব ব্যয় মিটিয়ে বছরে ১০০ কোটি টাকা ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হবে। অথচ বর্তমানে ওয়াসার আয়-ব্যয়ে সমান সমান রয়েছে। ফলে চরম আর্থিক সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৮৪৮ কোটি ৫২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। তার মধ্যে জিওবি ৮৮৪ কোটি ২১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। জাইকার অর্থায়ন ৯৪০ কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। আগামী ২২ সাল থেকে জাইকার অর্থের ঋণের কিস্তি শুরু হবে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শেখ রাসেল পানি শোধনাগার বাস্তবায়িত হয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৮৯০ কোটি ৮২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। বিশ্বব্যাংককে ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ২০২২ সাল থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ শুরু হবে। কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-২ জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৪ হাজার ৪৯১ কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ২০২২ সালে ঋণের কিস্তি শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে ভান্ডারজুরি প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। প্রকল্প ব্যয় ১ হাজার ৩৬ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার টাকা।