হামলার ৩০ ঘণ্টা পর মামলা, আসামি ১৫০০

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হেফাজত-সমর্থকদের হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার ৩০ ঘন্টা পর দুটি মামলা হয়েছে। গত বুধবার সকালে এই হামলার ঘটনা ঘটলেও গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর শাল্লা থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি ও ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি অপর মামলাটি করেন। মামলা দুটিতে দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে তিনি জানান। 

এদিকে হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ৮০ বিশিষ্ট ব্যক্তি। হেফাজত নেতা মামুনুল হকসহ জড়িতদের গ্রেফতার দাবিতে সিলেট শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’ নামের একটি সংগঠন। সচেতন শাল্লাবাসীর ব্যানারে আজ শাল্লায় প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করা হয়েছে।

এই হামলা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি গতকাল বলেন, ‘নোয়াগাঁওয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।’ রাজধানীতে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

মামলা করতে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হামলার পর ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করবে কিনা সে অপেক্ষায় ছিল স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। তারা মামলা না করায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এটা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ। দেশে সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের কোনো রক্ষা নেই। যারা সম্প্রীতি বিনষ্ট করবে তাদের যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করা হবে।’ রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বটমলী হোমসে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বস্ত্র ও খাবার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা এক অশনি সংকেত। এ দেশের জনগণ এখন ভয়ংকর দুঃসময়ের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। সরকার সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি রক্ষা করতে পারেনি এবং তাদের নিরাপত্তাও দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’

ঘটনাস্থলে র্যাব ডিজি

সিলেটে অফিস ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শাল্লা পরিস্থিতি ক্রমেই শান্ত হয়ে আসছে। হামলার সময় গ্রাম  ছেড়ে  যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। তবে তাদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক কাজ করছে। গ্রামের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। র্যাব মহাপরিচালক আব্দুলাহ আল মামুন চৌধুরী গতকাল ঘটনাস্থলে যান। তিনি সেখানে পৌঁছালে সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মিছিল করতে থাকেন। পরে তিনি সবাইকে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বাড়িঘর পরির্দশন করেন।  এসময় র্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘এই শান্তির দেশে যদি কেউ অশান্তি সৃষ্টি করে তাহলে তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’ তিনি বলেন,‘ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে হামলা হয়েছে তা খুব দুঃখজনক। জড়িতরা কেউ রেহাই পাবে না। তাদের খুঁজে বের করে পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে। আক্রান্ত লোকদের আমরা বাড়িতে নিয়ে আসছি। আর যাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে আমরা সতর্ক থাকবো। ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ টি পরিবারকে ৫ হাজার করে নগদ টাকা ও ৭ মে.টন চাল প্রদান করা হচ্ছে। আজ শুক্রবার বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমানের উপস্থিতিতে এগুলো বণ্টন করা হবে।’ 

যেভাবে  হামলা!

স্থানীয়রা জানান, শাল্লা উপজেলা সদর থেকে অন্তত ৮ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের হিন্দু বাড়িঘরে হামলাকারীদের বেশিরভাগই পাশের দিরাই উপজেলার বসিন্দা। ঘটনার দিন সকালে দিরাইয়ের নাচনি গ্রামে মাইকিং করে মিছিলে অংশ নেওয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানানো হয়। নোয়াগাঁও গ্রামের বেশির ভাগ লোক  হিন্দু এবং দরিদ্র। গ্রামে ঘর আছে শ’খানেক। বাসিন্দাদের সকলেই পেশায় কৃষক ও মত্স্যজীবী। গ্রামের এক তরুণ মঙ্গলবার ফেসবুকে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। যার স্ক্রিনশট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। যাতে মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে সামপ্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতার অভিযোগ আনা হয়। এতে মঙ্গলবার রাত থেকেই এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়।  রাতেই ঐ তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে বুধবার সকালে আবার এলাকায় বিক্ষোভ দেখা দেয়।

শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ইত্তেফাককে জানান, এসময় সংঘবদ্ধভাবে সশস্ত্র বিক্ষোভকারীরা নোয়াগাঁও গ্রামের প্রায় ৮৮টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এরমধ্যে ৩৫টি বাড়ি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৮টি পারিবারিক মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। তখন পরিস্থিতি ছিল  নিয়ন্ত্রণের বাইরে। হামলার আকস্মিকতায় এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন প্রাণ ভয়ে হাওরে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হামলাকারীদের মিছিলে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ লোকই ছিল দিরাই উপজেলার নাচনি, চন্ডীপুল, সরমঙ্গল, কাশিপুর, সন্তোষপুর এবং শাল্লা উপজেলার কালিমপুর ও কাশিপুর গ্রামের। অধিকাংশই ছিল বয়সে তরুণ।

এদিকে দিরাই উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সমপাদক মুক্তার হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, এভাবে হামলা-ভাঙচুর হেফাজতে ইসলাম সমর্থন করে না। এটি নিন্দনীয় কাজ। তিনি  হামলা-ভাঙচুরকারীদের  শাস্তির দাবি জানান।

৮০ বিশিষ্ট ব্যক্তির  বিবৃতি

সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হেফাজতে ইসলামের সামপ্রদায়িক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশের ৮০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। গতকাল বৃহস্পতিবার একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ও কার্যনির্বাহী পরিষদের বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সুনামগঞ্জের হিন্দু অধ্যুষিত কয়েকটি গ্রামে মাইকে ঘোষণা দিয়ে শতাধিক বাড়িতে হামলা, মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার সংবাদে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। স্বাধীনতার মাসে মুক্তিযুদ্ধের আত্মস্বীকৃত বিরোধিতাকারী মৌলবাদী দুর্বৃত্তদের এ ধরনের ন্যক্কারজনক কর্মকান্ডের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। বিবৃতিতে এসব দলের সকল সমাবেশ অবিলম্বে নিষিদ্ধ করার জোর দাবি জানানোর পাশাপাশি সুনামগঞ্জে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং ভুক্তভোগীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন:বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি শামসুল হুদা, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, লেখক সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী, অধ্যাপক অনুপম সেন, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী রফিকুননবী, অধ্যাপিকা পান্না কায়সার, অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম, কথাশিল্পী ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আলমগীর সাত্তার বীরউত্তম, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবদুর রশীদ (অব.), লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, সমাজকর্মী আরমা দত্ত এমপি, কথাশিল্পী মুহম্মদ জাফর ইকবাল, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা প্রমুখ।

সিলেটে মিছিল সমাবেশ

সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনায় হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হকসহ জতিড়দের গ্রেপ্তারের দাবিতে সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে সামপ্রতিকালে নানা কর্মকান্ডের প্রতিবাদের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠা সংগঠন ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’। গতকাল  সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। পরে দেবাশীষ দেবুর পরিচালনায় প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্যে রাখেন  সংগঠক আবদুল করিম কিম, জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদির আহমদ মুক্তা, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি  কাসমির রেজা, গণজাগরণ মঞ্চ সিলেটের সংগঠক রাজীব রাসেল, জেলা ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি মাসুদ রানা চৌধুরী প্রমুখ।