প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘আসুন, সবাই মিলে আমরা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলি। আমাদের আগামী প্রজন্মকেও যেন উত্সাহিত করি। বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে শিক্ষায়, দীক্ষায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নে, সাংস্কৃতিক উন্নয়নে, সর্বক্ষেত্রে—সামাজিক ন্যায়বোধে আমরা এই দেশকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলি।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমি চত্বর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাসব্যাপী অমর একুশের বইমেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে বাংলা একাডেমির মূল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে পিছিয়ে যাওয়া অমর একুশে বইমেলার দুয়ার খুলল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছোটদের বইয়ের প্রতি ঝোঁক বাড়ানো দরকার। আমাদের সময় বাচ্চাদের বই পড়ে শোনানো হতো। এখনো আমরা তা করি। সব সময় ঘরে একটা ছোট লাইব্রেরি করে রাখি। বইয়ের প্রতি ঝোঁক বাড়াতে হবে। পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে মানুষের কাছে যত দ্রুত পৌঁছা যায়, সাহিত্যে আরো আগে পৌঁছা যায়। সাহিত্যের মাধ্যমে ইতিহাস, ভাষা-সংস্কৃতিও জানা যায়।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন তো মোবাইল ডিভাইসেও পড়ার সুযোগ আছে। তবে বই হাতে নিয়ে বইয়ের পাতা উলটে পড়ার আনন্দই আলাদা। বইয়ের আবেদন মুছে যাবে না। সেজন্য প্রকাশকদের ধন্যবাদ, মহামারির সময়েও অনেক কষ্ট করেছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারে থাকি আর বিরোধী দলে থাকি এক দিনের জন্য হলেও বইমেলায় যাই। এখন করোনার কারণে যেতে পারছি না। কারণ আমি গেলে ১ হাজার লোকের সম্পৃক্ততা হয়। তাদেরও সবার সংক্রমণের কথা চিন্তা করে আমি যাচ্ছি না। তবে আমার মনটা পড়ে আছে সেখানে।’ এ সময় ভাষা দিবস ও ভাষা আন্দোলনের নানা ইতিহাস তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন জানতে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের নানা রিপোর্ট সাত খণ্ডে প্রকাশ করেছি। এগুলো পড়লেই বোঝা যাবে বঙ্গবন্ধু কীভাবে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, আন্দোলনের সমন্বয় করেছেন।’
স্বাস্থ্য সুরক্ষা মানার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা ভাইরাস অনেক ক্ষতি করেছে। জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে গেছে। এটি কাটিয়ে উঠতে আমরা নানা পদক্ষেপ নিয়েছি।’ করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হয়ে গেছে—উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘টিকা দিয়ে সুরক্ষিত মনে করবেন না। মাস্ক পরবেন, হাত ধোবেন ও দূরত্ব রক্ষার মাধ্যমে নিজেকে ও অন্যকে সুরক্ষিত রাখবেন। বইমেলায় যাবেন, ধরবেন। কিন্তু নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন।’
বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী এবং সংস্কৃতিসচিব মো. বদরুল আরেফিন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ১০ জনকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করেন। এবার এ পুরস্কার পেয়েছেন—কবিতায় কবি মুহাম্মদ সামাদ; কথাসাহিত্যে ইমতিয়াজ শামীম; প্রবন্ধ সাহিত্যে বেগম আখতার কামাল; অনুবাদে সুরেশ রঞ্জন বসাক; নাটকে রবিউল আলম; শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন; মুক্তিযুদ্ধ সাহিদা বেগম; বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানে অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়; আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা ও ভ্রমণকাহিনি বিভাগে ফেরদৌসী মজুমদার এবং ফোকলোর বিভাগে হাবিবুল্লাহ পাঠান। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু লেখা ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থের ইংরেজি ভার্শন (নিউ চায়না ১৯৫২)-এর মোড়ক উন্মোচন করেন।
২৮ দিনব্যাপী বইমেলা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও, করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে মেলাটি যে কোনো সময় বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২১-এর মূল প্রতিপাদ্য ‘বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’।
বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে এর সংক্রমণ ঠেকাতে বইমেলায় নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা। প্রবেশপথে থাকবে ‘নো মাস্ক নো এন্ট্রি’ সংবলিত লোগো। মেলাপ্রাঙ্গণ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় (সমগ্র মেলাপ্রাঙ্গণ ও দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি হয়ে শাহবাগ, মত্স্য ভবন, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত এবং দোয়েল চত্বর থেকে শহিদ মিনার হয়ে টিএসসি, দোয়েল চত্বর থেকে চানখারপুল, টিএসসি থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত) নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে।
বইমেলা সবার জন্য কার্যদিবসগুলোতে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোতে সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে। দুপুরের খাবার ও নামাজের জন্য এক ঘণ্টা বিরতি থাকবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক আলোচনার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন এবং গত এক বছরে প্রয়াত বিশিষ্টজনদের জীবন ও কৃতি নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।