মার্চ হচ্ছে আমাদের কাছে অধিকার আদায়ের মাস, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মাস। তাই এ মাসের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ২ মার্চ, ৭ মার্চ, ২৫ মার্চ, ২৬ মার্চের ঘটনাবলি বাঙালিকে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, তার গুরুত্ব অপরিসীম।এই মার্চের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ১৭ মার্চ। দিনটি আমাদের জন্য আনন্দের। কারণ এই দিন টুঙ্গিপাড়ায় ‘খোকা’, অর্থাত্ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে আমরা স্বতন্ত্র ভৌগোলিক সীমানা পেতাম না। তাই মার্চে শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্মই হয়নি, মার্চে একটি জাতির জন্ম হয়েছে।
এই মার্চের শুরুতে বাংলার আকাশে পতপত করে উড়েছিল স্বাধীনতার পতাকা। মার্চের ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা গৌরবের এ পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
এর মধ্যে ঢাকার রাস্তায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাঁজোয়া যানের বহর বেড়ে গেলে বঞ্চিত-নিপীড়িত বাঙালি যেন ফুঁসতে থাকে। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার মাঝে বাঙালির মহান নেতার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় যেন তাদেরই না বলা কথা, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই উচ্চকিত উচ্চারণ গোটা জাতির মধ্যে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়ে দেয়।
গোটা জাতি যখন ক্ষোভে ফুঁসছিল, ঠিক তখন ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানের হানাদাররা। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর শপথ নিয়ে দলে দলে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার দামাল ছেলেরা। মুক্ত করে স্বদেশ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ষাট-সত্তরের দশকে বিশ্ব জুড়েই একটা অস্থিরতা বিরাজ করছিল। কয়েক দশক ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম চলছিল। একদিকে কমিউনিস্টদের বিপ্লব চলছিল, অন্যদিকে মুক্তির জন্য লড়াই চলছিল বিশ্বের বেশ কয়েকটি রণাঙ্গনে।
তবে, বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম ছিল অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের স্বাধীনতার এই যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের একমাত্র জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল এই যুদ্ধে। দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী, তথা বাঙালি জাতির দীর্ঘকালের সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।
জাতি হিসেবে যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটা এই মার্চ আমাদের দিয়েছে। এ হিসেবে বলা যায়, মার্চ হচ্ছে বাঙালি জাতিকে তার নিজস্ব অধিকারবঞ্চিত করার প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের একটি মাস।
তাই অগ্নিঝরা মার্চে আবারও শপথ নিতে হবে, যে চেতনা ও বিশ্বাস নিয়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই জায়গা থেকে নতুন প্রজন্মকে আবারও শপথ নিতে হবে অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার, যে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এক্ষেত্রে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। মার্চের চেতনায় গড়ে উঠুক নতুন প্রজন্ম।
লেখক : উপাচার্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়