অন্ধকারাচ্ছন্ন অরণ্যঘেরা কয়েকটি গ্রাম পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠের মাঝখানে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে উপুড় করা বাটির মতো নিতল আকাশের দিকে তাকিয়ে যুবকেরা নক্ষত্ররাজির আলো দেখে নিশ্চল চোখে। এই বিস্তৃত সমতল মাঠে দাঁড়িয়ে কোনো দিক-দিশানা খুঁজে না পেয়ে নক্ষত্ররাজির মধ্যে আদম সুরুত অনুসন্ধান করে এবং ওখানে দাঁড়িয়েই তারা অনুমান করতে পারে ঠিক নাক বরাবর মাঠের মাঝখান দিয়ে সোজা চলে গেলে পাঁচ-ছয় ক্রোশ দূরে একটি শান্ত নদী; সেই নদী পেরিয়ে যাওয়ার পর তিন ক্রোশ দূরে পাহাড়-অরণ্য এবং তারপরেই সীমানা পেরিয়ে অভীষ্ট গন্তব্য। যুবকেরা সংখ্যায় ত্রিশজন। এই সময় দলের নেতা আবু জহিরের কানে একটা অলৌকিক শব্দ ভেসে আসে যে শব্দটি সহসা বুদ্ধিগম্য হয়নি যদিও, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই শব্দটি মনে হয় কানের কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় যার অর্থ দাঁড়ায়—এগিয়ে যাও। এই দুর্গম পথ পেরুলেই তোমরা সুগম্য পথের সন্ধান পাবে। যুবক আবু জহির সবাইকে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে রাত্রি শেষে সূর্যাস্তের সময় আমাদের নির্ঘাত্ মৃত্যু। আমাদের চারপাশে শত্রু আর শত্রু। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি রাতের মধ্যে দুর্গম পথ পাড়ি দিলে সূর্যোদয়ের আলোয় আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাব। ত্রিশজন যুবকের মধ্যে তিনজন প্রায় সমস্বরেই বলল, এটাই যে আমাদের পথ কী করে বুঝব?
এই তিনজন যুবকের ঘাড়ত্যাড়া কথা আগেও শুনেছে; তবু বিপন্ন সময়ে ওদেরকে না খেপিয়ে শান্ত গলায় বলল, গেরিলা যোদ্ধাদের আশ্রয়ই দুর্গম প্রান্তর, অরণ্য এবং তাদের বিশ্রামের স্থানই হলো জলকাদার মৃত্তিকা। তিন যুবক পুনরায় বলল, আমাদের যাত্রাপথ সঠিক নাও হতে পারে। তারা ফিরে যায় নিজ নিজ গৃহে।
আবু জহির বলল, ওদের কাছে মাতৃভূমির দায় নেই; ওরা চিরকালই বিভ্রান্ত।
অন্য যুবকেরা দুর্গম-বন্ধুর পথ পেরিয়ে এগিয়ে যায় নির্ভীক চিত্তে এবং সূর্যোদয়ের পরে এক ঝলমলে আলোর সকালে তারা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছায়।
নয় মাস পর আবু জহির এবং তার সতীর্থরা লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে নিজ ভূমিতে ফিরে উল্লিসিত জনতার ভিড়ে মিশে দেখে ঐ ফিরে আসা তিন যুবকও উল্লসিত। এতে আবু জহিরের মনে কোনো ক্লেশ ছিল না। কিন্তু চার বছর পর যখন কোনো জোছনা রাতে আবু জহির একা একা রাজপথ ধরে মাথা নুয়ে হাঁটে তখন শুনতে পায়, ঐ তিন যুবকের একজন বলছে, আমরা সেদিন বিভ্রান্ত ছিলাম। সঠিক পথ কোনটি হবে বুঝতে পারিনি।
প্রকাশ্যে কিছু বলার সক্ষমতা আবু জহির শুধু নয়; লক্ষ কোটি মানুষ হারিয়েছে এবং এইজন্য সে মনে মনে বলল, বিভ্রান্তরা চিরকালই বিভ্রান্ত এবং নিজেদের রসায়ন সংক্রমণ করে সরল মানুষের মগজে।