সৃষ্টিশীল চেতনায় বইমেলা

জুলফিকার বকুল

এ যেন মহা মিলন মেলা। আত্মিক টানেই জেগে ওঠে বইপ্রেমী সত্তা। প্রতিটি স্টল হয়ে ওঠে একেকটি মুখরিত আঙিনা। যেখানে পাঠকরা নিমন্ত্রিত অতিথি। কেউ বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে, কেউ দু-এক পাতায় দৃষ্টি দিয়ে নিজেকে নিয়ে যায় চিরচেনা কোনো ভালোবাসার রাজ্যে, কেউ ফিরে পায় হারানো অতীত, কেউবা খোঁজে সম্ভাবনার ভবিষ্যত্। কী নেই এখানে!

মার্কাস টুলিয়াস সিসারোর উক্তি—A room without books is like a body without a soul। প্রকৃতপক্ষে বই তখনই মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যায় যখন সে তার অন্তরের মাঝে একটি জানার জগত্ তৈরি করে। আর তখনই সার্থকতার ছোঁয়ায় কম্পিত হূদয়ে জাগে প্রাণোচ্ছল সুখানুভূতির শিহরণ। মানুষ হয়ে ওঠে সত্যসন্ধানী। জ্ঞানপিপাসা মেটাতে মানুষের অন্তরালের মানুষকে খুঁজতে থাকে। ছুটে আসে হাজার মানুষের ভিড়ে স্বপ্নের মানুষটির সান্নিধ্যের প্রত্যাশায়।

বইমেলা শুধু জ্ঞানেরই রাজ্য নয়। ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনের মধ্য থেকে একটু সময় করে, অন্তর্নিহিত কৌতূহলে মন রাঙানোর পাশাপাশি মানসিক উত্কর্ষ সাধনে নানা রঙে রাঙিয়ে হূদয়ের মেলবন্ধনে প্রাণের মেলাকে সার্থক ও প্রাণবন্ত করে তোলে। চেতনায় জাগ্রত হয় জ্ঞানের স্পৃহাসহ বইয়ের প্রতি মমত্ববোধ। এ যেন অন্যরকম এক সম্প্রীতির সম্ভারে উদ্বেলিত সাগরে ঢেউয়ের হাতছানি!

বইমেলার আয়োজন আছে বলেই দেশবরেণ্য লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা এবং কথা হচ্ছে। অনুপ্রেরণায় আবির্ভাব হচ্ছে নতুন লেখকদের। আসলে লিখতে গেলে ভালো পাঠক হতে হয়, অনেক পড়তে হয়। তাই নতুন লেখক যত সৃষ্টি হবে ততই পাঠক সংখ্যাও বাড়বে। কাজেই নতুন লেখকদের চিন্তাধারা প্রকাশে বইমেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি শব্দ কিংবা শব্দের তৈরি বাক্য যেমন পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি একটি বই বা তার বুকে লিপিবদ্ধ একটি বাক্য একজন মানুষের জীবনকে ইতিবাচক দৃষ্টি দিতে পারে। তরুণদের দ্বারাই যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে। বইমেলাকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের মাঝে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা, তা পূরণের নিমিত্ত উত্সাহ ও উদ্দীপনায় প্রেরণা জোগানোটা আমাদের মহত্ত্বের পরিচয় বহন করে।

একদিন উন্নত, শিক্ষিত জাতি হিসেবে আমরা প্রথম সারিতে পৌঁছাব—যে স্বপ্ন আমরা প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ ও লালন করে যাচ্ছি। তাই দেশের জনসমষ্টিকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। মনের অন্ধকার, কুসংস্কার দূর করে সাফল্যের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের একমাত্র কাম্য। বই মানুষকে ইতিবাচক ভাবনায় ভাবিয়ে তোলে। যে ভাবনা তার জীবনকে সুসংগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত করে দেশের সম্পদে পরিণত করে। তাই বইমেলা জাতীয় জীবনে গভীর তাত্পর্যময়।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে এবার বইমেলা শুরু হয়েছে এই স্বাধীনতার মাসে, আমরা যখন আমাদের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। প্রাণের মেলা তার অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখে পাঠক হূদয়ের অদম্য চাওয়া পূরণ করতে পারবে বলে আশা করি। যেখানে মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলার আয়োজন জাতীয় জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। তাই বইমেলা এগিয়ে চলুক তার আপন গতিতে, জেগে উঠুক বইপ্রেমী হূদয়ের স্পন্দন, বইমেলার অনিন্দ্য স্বাদের তৃপ্তিতে ভুলে যাক অতীতের যত বেদনা, চির সবুজের দেশে রক্তিম সূর্যের আলোকিত শিখায় বইমেলা বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি।

গাজীপুর