অর্থনীতি ডেস্ক
এক বছর আগে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ার পর অন্যান্য ছোট-বড় সব খাতের ন্যায় বিপাকে পড়েন নারী উদ্যোক্তারাও। এরপর সরকারের প্রণোদনা সহায়তাসহ উদ্যোক্তাদের অদম্য শক্তিতে ফের স্বাভাবিক হওয়ার পথে রয়েছে অর্থনীতি। তবে এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। দেশের অর্থনীতির বড় অংশ জুড়েই রয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। সরকার গত বছর করোনার প্রকোপ বাড়ার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল রাখতে যে বিপুল প্রণোদনার ঘোষণা দেয়, তার মধ্যে এসএমই খাতের জন্য বরাদ্দ ছিলো ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার শর্তও ছিল। তবে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বেশির ভাগ নারী উদ্যোক্তাই প্রণোদনার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা না পাওয়া অভিযোগ এনেছেন। কিংবা ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন প্রক্রিয়া রয়েছে, যাতে তারা ঋণের জন্য আবেদনও করতে পারেন না। এই সমস্যা অবশ্য নারী উদ্যোক্তাদের বাইরে পুরো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যই প্রযোজ্য।
সম্প্রতি নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে পাঁচ জন নারী উদ্যোক্তার মধ্যে চার জনই তাদের এ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছেন। একজন উদ্যোক্তা আবার ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথাও জানান। তিনি বলেন, তার ব্যাংক থেকে সংশ্লিষ্ট প্রণোদনার ঋণ অনুমোদন হয়েছে জানিয়ে ব্যাংকে চেক পাঠাতে বলেন। চেক পাঠানোর পর দেখা গেল প্রণোদনার অর্থ উঠিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা ঐ উদ্যোক্তাদের আগের ঋণের টাকা কেটে রেখে দিয়েছেন। অর্থাত্ ঋণ অনুমোদন হলেও তিনি হাতে টাকা পাননি।
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. নাজনীন আহমেদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায়ও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন চ্যালেঞ্জর ইস্যুটিই ঘুরেফিরে এসেছে। ঐ গবেষণাপত্রে বলা হয়, নারী উদ্যোক্তাদের ইস্যুটি এখনো কম গুরুত্ব পাচ্ছে। এজন্য তাদের উঠে দাঁড়ানোও দেরি হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। তারা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাদের টেকসই অগ্রগতি, ক্ষমতায়ন, ঝুঁকি কমিয়ে আনার স্বার্থে নারী উদ্যোক্তাদের শক্তিশাীল করতে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
তার গবেষণায় নারী উদ্যোক্তাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো এসেছে, তার মধ্যে অর্থায়ন সমস্যার পাশাপাশি বড় অঙ্কের ঋণ প্রাপ্তির চ্যালেঞ্জও উঠে আসে, যার কারণে তারা ব্যবসাকে প্রসারিত করতে পারছেন না। নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিস্তর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি এছাড়া বাজার ও নতুন সম্ভাবনা কিংবা সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও যথাযথ তথ্যের অভাব, দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণের ঘাটতি। করোনা পরিস্থিতি এ চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো তীব্র করেছে।
করোনা শুরু হওয়ার পর গত বছর পহেলা বৈশাখ ও রোজার ঈদ ও পূজাকেন্দ্রিক বড় উত্সবে বিক্রি বলতে গেলে হয়নি। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন। এছাড়া দৈনন্দিন স্বাভাবিক বিক্রিও হয়নি। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো ধীর গতিতে চলছে।
দেশের বিপুলসংখ্যক নারী উদ্যোক্তার এগিয়ে যাওয়ার পথ মসৃণ রাখতে হবে দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই। এ পরিস্থিতিতে সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের যথাযথ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ড. নাজনীন আহমেদের গবেষণাপত্রেও এ ইস্যুটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন এবং এই প্রণোদনায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা যাতে ঋণ পেতে পারেন—সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ফাউন্ডেশন কিংবা অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে (এনজিও) বিশেষ ঋণদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন, বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমকে সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীনের আলীবাবা ক্ষুদ্র উদ্রোক্তাদের পণ্য বিক্রয়ের অনলাইন প্ল্যাটফরম হিসেবে একটি ভালো উদাহরণ। দেশেও এ ধরনের বেশকিছু অনলাইন প্ল্যাটফরম রয়েছে। এসব উদ্যোগকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।