বাংলাদেশের ইতিহাসের দুই মাহেন্দ্রক্ষণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মিরপুরের সরকারি পিএইচ সেন্টারের বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ইশারা ভাষায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১০ দিনের যে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে, তাতে শুক্রবারের অনুষ্ঠানের থিম ছিল ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা’। অনুষ্ঠান উদ্যাপনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই উন্নয়নচিত্রই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্মাননা। এছাড়া রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ভি লাভরভ বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাশিয়ার প্রকৃত বন্ধু।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চাই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠুক। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ সব দিকে বাংলাদেশের মানুষ যেন উন্নত, সমৃদ্ধ জীবন পায়, যেটা জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল, যা তিনি সব সময়ই বলতেন। আসুন, জাতির পিতার এই ১০১তম জন্মদিন আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা সেই প্রতিজ্ঞা নিই, জাতির পিতা যেই স্বপ্ন রেখে গেছেন, সেই স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করব। বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সোনার বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশ আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত হতে পেরেছি। বাংলাদেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলাম বলে আজ আমরা সরকারে থেকে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করার সুযোগ পেয়েছি, এজন্য এদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ যে বিদেশি অতিথিরা ১০ দিনের এই আয়োজনে যোগ দিয়েছেন, তাদেরও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। শ্রীলঙ্কাকে বাংলাদেশের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা বিভিন্ন আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একই ধরনের মনোভাব পোষণ করে এবং দুই দেশ পরস্পরকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষের যোগদান তার নিজের এবং শ্রীলঙ্কার জনগণের আমাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেরই প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী তার সরকার এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীকে এবং তার দেশের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের জনগণের এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরো দৃঢ় হবে। অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ এবং ২ লাখ নির্যাতিত মা-বোনের কথা স্মরণ করার পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সালাম জানান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটে নিহত নিজের পরিবারের সদস্যসহ সেই রাতে নিহত সবার কথা গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করেন সরকার প্রধান।
শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার হাজার বছরের ব্যাবসায়িক যোগাযোগের প্রসঙ্গ টেনে সেটা আরো জোরদারে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছার কথা জানান। তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন ২ হাজার বছর আগে বঙ্গ অঞ্চল থেকে মানুষ শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ শতাব্দী থেকেই দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য চলছে বলেও মনে করা হয়। বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা সামনের সারির দেশ হিসেব শ্রীলঙ্কার ভূমিকার কথা স্মরণ করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন নীতিনিষ্ঠ মানুষ। দুর্ভাগ্যবশত তিনি তার প্রিয় দেশের জন্য যে স্বপ্ন লালন করছিলেন তা দেখে যেতে পারলেন না। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ঘটনা স্মরণ করে শেখ হাসিনার প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার ও ত্যাগের প্রতি এটাই সর্বোচ্চ সম্মান। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এই দেশের সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানাই। এক পর্যায়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হোয়ার দ্য মাইন্ড ইজ উইদাউট ফিয়ার’ বা প্রার্থনা কবিতাটির কয়েক চরণ আবৃত্তি করেন তিনি।
এদিকে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনন্য সাধারণ এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যিনি একজন লড়াকু নেতা হিসেবে জনগণের স্বাধীনতা ও সুখের জন্য নিজেকে উত্সর্গ করেছিলেন এবং রাশিয়ার সত্যিকারের বন্ধু ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানে দেওয়া ভিডিওবার্তায় মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের নানা দিকও তুলে ধরেন লাভরভ। ১৯৭২ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর রাশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সফরে যান বাংলাদেশের তখনকার সরকারপ্রধান শেখ মুজিব। সেই সময়ই সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থ বিবেচনার নীতির ওপর আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণ হয়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে মন্তব্য করে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনাদের দেশ অগ্রগতি ও ক্রমাগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মর্যাদা অর্জন করেছে। এর ফলেই দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে বৈশ্বিক সংঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশ ভূমিকা রাখছে। লাভরভ বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার বাংলাদেশ। এ সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সংলাপ ও পরস্পরের জন্য লাভজনক সহযোগিতা চালিয়ে নিতে প্রস্তুত রাশিয়া। লাভরাভ বলেন, আমরা আত্মবিশ্বাসী, আমাদের নাগরিকদের কল্যাণে দুই দেশের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে।