বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্র আকার ধারণ করে। প্রতিদিনই সামরিক বাহিনী পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংঘর্ষ হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ ছিল শুক্রবার। ঢাকা শহর থেকে ২২ মাইল দূরে অবস্থিত জয়দেবপুরে চীন নির্মিত অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল বাহিনীর একটি দলকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র করতে চেষ্টা করলে মারাত্মক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জনগণও এই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পাকিস্তান সৈন্যরা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে, ফলে কমপক্ষে ২০ জন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়।
এই সংবাদে শেখ মুজিব ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শেখ মুজিব বলেন, ‘বাঙালির ফিনকি দেওয়া রক্তের দাগ শহরে বন্দরে ছড়িয়ে আছে। জয়দেবপুরের মাটিও আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। বুলেট আর বেয়োনেট দিয়ে বাঙালির মুক্তির আন্দোলন স্তব্ধ করা কোনো শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।’ তিনি আরো বলেন যে, ‘যারা এ ধরনের দুরাশা মনে মনে পোষণ করেন, তারা বেকুবের স্বর্গেই বাস করছেন।’
১৯শে মার্চ (১৯৭১) উপদেষ্টাসহ শেখ মুজিব ইয়াহিয়ার সঙ্গে ৯০ মিনিটব্যাপী তৃতীয় দফা বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমেদ, কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও ড. কামাল হোসেন। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদেরকে বলেন, ‘আমি সর্বদা ভালোটা আশা করি, কিন্তু আবার খারাপের জন্য প্রস্তুত হয়েই থাকি। আমার ভূমিকা বিশ্ববাসীর কাছে সুস্পষ্ট রয়েছে।’ (দৈনিক পাকিস্তান, ২০শে মার্চ ১৯৭১)
এই দিনে শেখ মুজিবের তিন জন উপদেষ্টার সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের তিন জন উপদেষ্টারও দুই ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জুলফিকার আলি ভুট্টো ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হামুদুর রহমানকে ঢাকায় আসার জন্য জরুরি তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন। তার জবাবে ১৮ই মার্চ করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানান। তিনি বলেন যে, তিনি ১৬ই মার্চে শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে গোপন আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্টের নিকট কয়েকটি বিষয়ের ব্যাখ্যা চেয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ইয়াহিয়ার দিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা না পাওয়ায় তিনি ঢাকা যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অবশেষে মার্চের ২০ তারিখে প্রেসিডেন্টের আরেকটি আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতে ভুট্টো সদলবলে ঢাকায় যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তাড়াহুড়ার মধ্যে আহূত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো বলেন যে, ইয়াহিয়ার কাছ থেকে তিনি ‘সন্তোষজনক’ জবাব পেয়েছেন।
মার্চের ২০ তারিখে ভুট্টো ১৩ জনের এক প্রতিনিধিদলসহ ঢাকায় আসেন। ঢাকায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। কড়া সামরিক নিরাপত্তায় তিনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পৌঁছান। এ সম্পর্কে সচিত্র সংবাদ পরিবেশন করে দৈনিক পাকিস্তানে বলা হয়, ‘কড়া সামরিক প্রহরাধীন ভুট্টোকে বিমানবন্দর হতে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে নিয়ে আসা হয়। হোটেল প্রাঙ্গণে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক শ লোক ভুট্টোবিরোধী স্ল্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
সামরিক বাহিনীর লোকজন ভুট্টোকে চারদিক ঘিরে হোটেলের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। হোটেলের অভ্যন্তরেও একটি ক্ষুদ্র দল প্ল্যাকার্ডসহ তাকে বিক্ষোভ জানায়। এ সময় সামরিক বাহিনী সাংবাদিকদেরও ভুট্টোর কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। ভুট্টোর গাড়ির সামনে ও পেছনে সাব মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কয়েকটি সামরিক বাহিনীর গাড়ি ছিল। ভুট্টোর গাড়িতেও তার দুপাশে সাদা পোশাক পরিহিত স্বয়ংক্রিয় রাইফেলধারী দুই ব্যক্তি আসীন ছিলেন। তারা গাড়ির জানালা দিয়ে দুই দিকে রাইফেল তাক করে বসে ছিলেন। ভুট্টোকে এ সময় অত্যন্ত বিমর্ষ ও চিন্তাক্লিষ্ট দেখাচ্ছিল।’ (দৈনিক পাকিস্তান, ২২শে মার্চ, ১৯৭১)
লেখক :শিক্ষাবিদ ও সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়