সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর সেখানে এখনো আতঙ্ক কাটেনি। অনেকে বাড়িঘরে ফিরে আসেননি। হামলার অভিযোগে গ্রেফতার ২২ জনের জামিন নামঞ্জুর করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ইসরাত জাহানের আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এদিকে হামলার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জসহ সারা দেশে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। সমাবেশে বক্তারা হামালাকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি করেছেন। কোনো কোনো মহল এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে বলেছে, এর পেছনে জলমহাল দখলসহ অন্য কোন ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। এদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সুনামগঞ্জে আবারও আসছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক বলেন, খবর প্রচারের পর উদ্বেগ দেখা হয়েছে।
অন্যদিকে কোনো কোনো মহল এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে বলেছেন, ঘটনার নেপথ্যে জলমহাল দখলের বিষয়টি জড়িত বলে অনেকেই বলেন। তারা বলেন, সুযোগে তারা হামলা চালিয়েছে। দিরাই সরমঙ্গল ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার তোতা মিয়াসহ অনেকেই জানান, ঘটনার পেছনে গ্রামের একটি জলমহাল। পাশের একটি জলমহালের ইজারাদার সরমঙ্গল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা স্বাধীন মিয়া গত জানুয়ারি মাসে নীতিমালা উপেক্ষা করে ওই জলমহালটি সেচে মাছ ধরেন। এতে এলাকার কৃষকদের পানি সেচের সমস্যা দেখা দিলে মামুনুলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্টেটাস দেওয়া যুবক গ্রামের ঝুমন দাস আপন স্বাধীন মিয়ার বিরুদ্ধে স্টেটাস দিয়ে আইনবিরোধী কাজের সমালোচনা করেন। প্রশাসন জলমহাল নীতিমালা উপেক্ষা করে মত্স্য আহরণ করায় স্বাধীন মিয়াকে আর্থিক জরিমানা করে। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে স্বাধীন মিয়া আপন দাসসহ গ্রামবাসীকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। আর এই ঘটনার জের ধরে নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর হামলার ঘটনা। এলাকাবাসী জানান, এ হামলার ঘটনা পরিকল্পিত।
মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাস জানান, স্বাধীন মেম্বার জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরায় আমাদের গ্রামের লোকজন বাধা দিয়েছিল। জরিমানাও হয় তাদের। এ ঘটনায় প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। সেই ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে আমাদের গ্রামে হামলা ও লুটপাট করেছে বলে স্থানীয়রা জানান। ওসি বলেন, জলমহাল নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল।
শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধূরী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ গতকাল ইত্তেফাককে জানান, ঘটনার নেপথ্যে জলামহালের বিরোধ এটা তারা শুনেছেন। তবে ঘটনার দিন বিক্ষোভকারী দলকে প্রশাসন, পুলিশসহ তিনি লোকজনকে নিয়ে ঠেকিয়েছিলেন। কিন্তু ভিন্ন পথে এসে অপর একটি বিচ্ছিন্ন দল এই হামলা চালায়।
এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে
নোয়াগাঁও গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িছাড়া অনেক বাসিন্দা ঘরে ফিরলেও কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু ও মহিলারা। তবে প্রশাসন থেকে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধূরী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ গতকাল ইত্তেফাককে জানান, পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিকের দিকে। শুক্রবার এখানে প্রতিবাদ সমাবেশের কথা থাকলেও স্থানীয় এমপির অনুরোধে তারা তা স্থগিত করেছেন। তিনি জানান তার নামেও ফেসবুকে অপবাদ ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করবেন বলে জানান।
বৃহস্পতিবার রাতে দায়েরকৃত দুই মামলার একটির বাদী শাল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল করিম। অন্য মামলার বাদী স্থানীয় হাবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল। মামলায় আসামি করা হয়েছে দিরাই থানার সরমঙ্গল ইউনিয়নের চন্দ্রপুর ও নাচনী এবং শাল্লা থানার হবিবপুর কাশিপুর গ্রামের ১ হাজার ৫০০ জনকে। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে ঘটনার উসকানিদাতা নাচনী গ্রামের বাসিন্দা সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য স্বাধীন মিয়াকে।
হামলায় জড়িত কয়েক জনের নাম উঠে এসেছে
নোয়াগাঁওয়ে হিন্দুদের বাড়িঘরে চালানো হামলা-ভাঙচুর ও লুটের ঘটনায় পুলিশ কাউকে চিহ্নিত করতে না পারলেও গ্রামবাসীদের মুখে উঠে এসেছে কয়েক জনের নাম। শুক্রবার নোয়াগাঁও গ্রামে গেলে বাড়িঘর ভাঙচুরের দৃশ্য চোখে পড়ে। গ্রামবাসীরা দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার শহিদুল ইসলাম স্বাধীন ওরফে স্বাধীন মিয়া ও তার আত্মীয় ফখরুল ইসলাম পক্কনের কথা বলেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাশ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হামলার আগেই আমি পরিবারকে ফোনে বলে দিয়েছিলাম বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে। পরে হামলাকারীরা ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। এক পর্যায়ে তারা আমার বাড়িতে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। তখন তারা আমার কাছ থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা আর মোবাইল ফোনটি নিয়ে যায়। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, তারপরও আমাকে পিটিয়েছে। তাদের দু-এক জনকে চিনতে পেরেছি। তাদের একজন স্বাধীন মিয়া ও অপর জন পক্কন।’
দেখি প্রাণে বাঁচতে পারি না, তখন সব খুলিয়া দিয়া দেলাইছি...
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা জগত্ চন্দ্র দাস বলেন, ‘যখন দেখি প্রাণে বাঁচতে পারি না, তখন সব খুলিয়া দিয়া দেলাইছি’। বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্টু দাস বলেন, যখন হামলা হয় বাড়িতে ছিলাম না। স্ত্রীকে ফোনে বলেছিলাম, বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে বেড়িয়ে যেতে। কিন্তু সে যাবার সময় টাকা-পয়সা নিয়ে যেতে পারেনি। আমার ঘর ভাঙার পর তারা ৮০ হাজার টাকা নিয়ে যায়।
পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঘটনায় ২২ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আসামিদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করছি। তবে পুলিশ চিহ্নিতদের খুঁজে বের করতেই কিছুটা সময় লাগছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ৩২ বান্ডিল টিন এবং ৭ টন চাল দেওয়া হয় শুক্রবার। দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে সহায়তা তুলে দেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান ও সিলেটের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিভাগীয় কমিশনার বলেন, যারা হামলা চালিয়েছে তাদের পরিচয় কী আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। ডিআইজি বলেন, ঐ ঘটনার পরপর দুটি মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়ছে। যে কোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি আমরা বজায় রাখব।
আবার সুনামগঞ্জে আসছেন মামুনুল হক
সুনামগঞ্জে আবারও আসছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক। এমন খবরে এলাকায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ২১ মার্চ দুপুরে হেলিকপ্টারযোগে জামালগঞ্জ উপজেলায় খাবিনুল কোরআন মহিলা মাদ্রাসার মহাসম্মেলনে তার প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখার কথা।
এদিকে মহাসম্মেলনের পোস্টারে জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলীর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বিষয়টি তাকে জানানো হয়নি বলে তিনি বৃহস্পতিবার থানায় জিডি করেছেন। জামালগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল আলম জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি থানায় একটি জিডি করেছেন। সেখানে উল্লেখ করছেন তাকে না জানিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তার নাম পোস্টারে লিখে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন
নোয়াগাঁও গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার প্রতিবাদে এবং দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে সুনামগঞ্জে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার বিকালে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু যুব মহাজোট ও ছাত্র মহাজোটের আয়োজনে শহরের ট্রাফিক পয়েন্টে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু যুব মহাজোট দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি শোভন দেবের সভাপতিত্বে এ সময় বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট রাধাপদ সূত্রধর, পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নুর খান, যুব মহাজোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শৈলেন সূত্রধর, জেলা ছাত্রলীগ নেতা দীপ্ত বণিক, জেলা ছাত্র মহাজোটের সভাপতি জনি বণিক, সংগঠনের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি সুমন সূত্রধর, জেলা কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক সুব্রত দাস, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ কুমার দাস, ছাত্রলীগ নেতা সুদর্শন ব্যানার্জী, টিএসএস মৌলভীবাজার প্রতিনিধি কল্লোল দাস প্রমুখ।
তারা বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাঠের ঘটনার সঙ্গে জড়িত দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানের আহ্বান জানান।
হামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত : হেফাজতে ইসলাম
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি করা হয়। বিবৃতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার নিন্দা জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন ও হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। হামলার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামকে জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, শাল্লায় জলমহালের দখল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে দাঙ্গা ও হানাহানির ঘটনা নিয়মিত ব্যাপার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ফেসবুক পোস্টের নাটক সাজিয়ে নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে আমরা মনে করি। হামলা প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা ছিল দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, আক্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায় বলেছেন তারা আগেই মাইকে হামলার খবর শুনে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে গেছেন। হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে অবহিত থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন যথাসময়ে তত্পর হলো না কেন?