ত্রিপুরায় শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেশে ফেরানোর আর্তি পরিবারের

মুক্তিযুদ্ধের অনেক শহিদের কবর দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে-অবহেলায় পড়ে রয়েছে ত্রিপুরায়। বাংলাদেশের এই সূর্যসন্তানদের সমাধি দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন এসব শহিদ পরিবারের স্বজনেরা। নিজের মৃত্যুর আগে দেশের মাটিতে ভাইয়ের কবর দেখে যেতে চান শহিদ ইমদাদুলের ছোটভাই মুক্তিযোদ্ধা তাবিবুর রহমান (৭০)। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুতি জানিয়েছেন তিনি। অপর চার জন শহিদের মধ্যে সিপাই মোকমেদ আলী ও মো. জামাল উদ্দিনের পরিচয় পাওয়া গেলেও দুই জন মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় জানা যায়নি। কবর ও নামফলক ভেঙে যাওয়ায় তাদের নামও হারিয়ে গেছে। শুধু এই পাঁচ জনই নন এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধার কবর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সীমান্তের গ্রামগুলোতে।

ভারতের উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর মহকুমার কদমতলা ব্লকের চল্লিশদ্রোন নামের প্রত্যন্ত গ্রামের কদমতলায় একটি কবরস্থানে সন্ধান মিলেছে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট এস এম ইমদাদুল হক বীর-উত্তমসহ পাঁচ জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধির। অযত্ন-অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের শহিদ সূর্যসন্তানদের এ সমাধিগুলো। এই মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের সন্ধান পেয়েছেন ত্রিপুরার স্কুলশিক্ষক আব্দুল ছবুর। উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগর মহকুমার কদমতলা ব্লক সদর হতে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তরে চল্লিশদ্রোন গ্রামের বড় কবরস্থানে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ইমদাদুল হক বীর-উত্তমসহ পাঁচ জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধির সন্ধান পান এই বর্ষীয়ান শিক্ষক। ত্রিপুরার বিশিষ্ট লেখক অশোকানন্দ রায়বর্ধন বলেন, ত্রিপুরার বিভিন্ন স্থানে নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধার কবর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এদের কবর চিহ্নিত করে তার যথাযথ মর্যাদা রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

আব্দুল ছবুর এখন অসুস্থ। ত্রিপুরার হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছবুরের বয়স ছিল ১১ বছর। সেই সময়ের স্মৃতি বর্ণনা করেন তিনি। আব্দুল ছবুরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় এই প্রতিনিধির। তিনি জানান, লেফটেন্যান্ট এস এম ইমদাদুল হক বীর-উত্তমের সঙ্গে তার স্মৃতির কথা। ১৯৭১ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন আব্দুল ছবুর। চল্লিশদ্রোন গ্রামে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে ঐ ক্যাম্পে যেতেন তিনি। ক্যাম্পেই পরিচয় হয় ইমদাদুল স্যারের সঙ্গে। কখনো কখনো অঙ্ক কষাতেন, বইয়ের পড়াও দেখাতেন। শেষ দেখার দিন তিনি বলেছিলেন, ‘অপারেশনে যাব, কয়েক দিন ক্যাম্পে এসো না।’ চার-পাঁচ দিন পর ক্যাম্পে গিয়ে জানতে পারি ইমদাদুল স্যার যুদ্ধে মারা গেছেন। তিনি জানান, চল্লিশদ্রোন গ্রামের বড় কবরস্থানের পাশে লম্বাটিলা নামক স্থানে শহিদ ইমদাদুলসহ আরো চার জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার নামাজে জানাজা হয়। মাওলানা আব্দুল সালাম নামে একজন ইমাম এ জানাজা নামাজ পড়ান। পরে বড় কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর পাকা করা হয়। তিনি জানান, কেউ রক্ষণাবেক্ষণ না করায় কবরের প্রাচীর ভেঙে গেছে। পাঁচটি কবরের মধ্যে দুটি সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ায় তাদের নাম পরিচয় হারিয়ে গেছে। এখন ধ্বংসের শেষপ্রান্তে থাকা তিনটি কবরের মধ্যে শহিদ ইমদাদুল হক ছাড়াও সমাধির ফলকে লেখা অপর দুই শহিদ মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেন—সিপাই মোকমেদ আলী, রেজি: নম্বর ৩৯৪০০৮৮, বাড়ি কুমিল্লা জেলার গোয়ালপাড়ার কিসমত নোয়াপাড়া গ্রাম। তিনি শহিদ হন ১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবর এবং মো. জামাল উদ্দিন, রেজি: নম্বর ৩৯৫০০১৭, বাড়ি কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার বিজয়নগরের পারাবন গ্রামে। তিনি শহিদ হন ১৭ অক্টোবর ১৯৭১। লেফটেন্যান্ট ইমদাদুল হকসহ এ দুই জন মুক্তিযোদ্ধাও ৮ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য। ছবুর বলেন, এখনি সমাধিগুলো সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অচিরেই এগুলো সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে।

এদিকে গোপালগঞ্জ সদরের মধুমতী নদীর তীরবর্তী মাটলা গ্রামের শহিদ লেফটেন্যান্ট এস এম ইমদাদুল হকের বাড়ি। তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা এস এম তাবিবুর রহমান এখন বসবাস করেন রংপুরে। তিনি দেশের জন্য নিজের প্রাণ উত্সর্গ করা এসব শহিদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইমদাদুল পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। তিনি সেখান থেকে পালিয়ে এসে পরিবারের সঙ্গে দেখা না করেই অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রথমে যুদ্ধ করেন ১১ নম্বর সেক্টর এলাকায়। পরে জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর ভারতের ক্যাম্প থেকে ১০০ জনের মুক্তিযোদ্ধার একটি গ্রুপ নিয়ে মৌলভীবাজারের ধামাই চা-বাগানে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমণ করতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বাধে। প্রচণ্ড এ যুদ্ধে শহিদ হন ইমদাদুলসহ অপর দুই মুক্তিযোদ্ধা। পরে সহযোদ্ধারা তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ভারতের ত্রিপুরায় সমাহিত করেন।

তাবিবুর রহমান আরো জানান, দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধে ইমদাদুল শহিদ হওয়ার কথা জানতে পারেন তারা। শহিদ ইমদাদুল ছাড়াও পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ও তার আরেক ভাই ইনামুল কবির মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বর্তমানে তিনি ছাড়া বাবা-মা ভাইবোন কেউ বেঁচে নেই। শহিদ ইমদাদুলের কবর ভারতের ত্রিপুরা থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে তাবিবুর বলেন, ‘আমার মৃত্যুর আগে গোপালগঞ্জের মাটিতে আমার ভাই শহিদ ইমদাদুলের কবর ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমার প্রাণের দাবি।’

এদিকে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ ইমরান সম্প্রতি ত্রিপুরা সফরে গিয়ে রামগড়-সাব্রুম সীমান্তে নির্মাণাধীন বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু পরিদর্শনকালে ত্রিপুরায় শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ইমদাদুল হক বীর-উত্তমসহ অন্য শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি সংরক্ষণ প্রসঙ্গে বলেন, ত্রিপুরার সহকারী হাইকমিশনারকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি