গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান:তেজস্ক্রিয়া

মাধব রায়

কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

           

নীলকান্তবাবু বিন্দুকে আদর দিয়ে পড়ার টেবিলে বসিয়ে চলে গেলেন বেডরুমে। একটু রেস্ট নিয়ে আবার টেবিলে এসে বসলেন। বাচ্চা-কাচ্চাদের কাছে বসলে এরা পড়ায় মনোযোগ দেয় বেশি। অন্যমনস্কতার আশংকা কমে। তাঁর ছেলে মেয়েরা অবশ্য এমন নয়, তবু তিনি এসে বসলেন। কিছুক্ষণ পর কমলা উঠে এলেন। তার রেস্ট নেয়া শেষ। রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকালবেলা চা-সিঙ্গাড়া দিয়ে এক প্রস্থ নাস্তা হয়ে গেছে। এবারে রাতের রান্না-বান্নাটা সেরে নিতে হবে। এসে দেখলেন বিন্দু পড়ছে। ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন-কিছু একটা হলেই কান্না চলে আসে, বয়স তো আর কম হলো না। কয়দিন পরই তো হাইস্কুলে উঠে যাবি।

বিন্দু লজ্জা পেলো। মাথা নিচু করে পড়তে থাকল। কথাটা তার মনে দাগ কেটেছে। বয়স তো আর কম হলো না...। সে ভাবতে লাগলো, তার চেয়ে বয়সে বড় হচ্ছে অণুদা, এরচেয়ে বড় হচ্ছে মা। এর চেয়ে বড় হচ্ছে বাবা, বাবার বয়স এখানকার সবার চাইতে বেশি। বাবার বয়সের চেয়েও বেশি ছিল বাবার মা-বাবার। এর চেয়ে বেশি তাঁদের মা-বাবার, এর চেয়ে বেশি তাঁদের মা বাবার...এভাবে সবার চেয়ে বেশি বয়স কার? পৃথিবীর বয়সটাই বা কত? বয়স মাপেই বা কীভাবে? বাবাকে বলতে হবে। পড়ার বই বন্ধ করে দিলো।

নীলকান্তবাবু বললেন, কী রে মা পড়তে মন বসছে না?

বিন্দু চুপ করে থাকল।

কমলা বললেন-আজকে রাতের খাবারটা ডিম দিয়ে হবে। হাঁসের ডিম, বড় বড়। তিনি জানেন বিন্দু হাঁসের ডিম খেতে ভালোবাসে।

নীলকান্তবাবু বললেন-সবচেয়ে বড় ডিম হয় উট পাখির।

রেখা বলল, সে তো সবাই জানে।

নীলকান্তবাবু বললেন, ইদানিং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিমের সন্ধান পাওয়া গেছে।

খাওয়া যাবে? বললেন কমলা।

না, না, খাওয়া যাবে না। ২০১১ সালে এন্টার্কটিকা মহাদেশের সেইমোর দ্বীপে ৬ কোটি ৮০ লাখ বছর আগের এক প্রাচীন জীবাশ্ম নমুনার সন্ধান পায় বিজ্ঞানীরা। এটি ছিল চুপসানো ফুটবলের মতো দেখতে। এখন তাঁরা বলছেন এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিম।

সর্বাপেক্ষা বৃহত্তম কোনটি? কমলা বললেন, বাকিরা হা করে শুনছে এই মজার ঘটনা।

বৃহত্তম ডিমটি ছিল উড়তে না পারা হস্তি পাখির (Elefent Bird), যেটি মাদাগাস্কারে পাওয়া গিয়েছিল। মাত্র কয়েকশ শতাব্দী আগে হস্তি পাখি বিলুপ্ত হয়ে যায়। দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিমটি ডাইনোসরদের আমলের কোনও দানব আকৃতির প্রাণীর। ডিমের এই ফসিলটির আকৃতি ২৮ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ২৮ সেন্টিমিটার প্রশস্ত। চিলি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চিলির জাতীয় জাদুঘরের বিজ্ঞানীরা ফসিলটির সন্ধান পেয়েছেন।

রেখা বলল-কিন্তু এই ডিম যে ৬ কোটি ৪০ লাখ বছর আগের, তা কীভাবে বুঝল?

রেখার প্রশ্ন শুনে বিন্দু একটু সাহস পেলো মনে। তার মনের মধ্যে জেগে থাকা প্রশ্ন সে আর আটকে রাখতে পারল না। রেখার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই সে-ও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো। পৃথিবীর বয়স কত বাবা?

নীলকান্তবাবু খুশি হলেন মনে মনে। বিন্দুর মন ভালো হতে শুরু করেছে। সে আবার পদার্থবিজ্ঞানের গল্প শুনতে ভালোবাসে না। রাক্ষস খোক্কস, জিন-পরী, দেও-দানবের গল্পে তার আগ্রহ বেশি। সেগুলোও শুনবে, কিন্তু বিজ্ঞানের গল্প তো অবশ্যই শুনতে হবে। বাচ্চাদের সামনে বিজ্ঞানকে আকর্ষণীয় করে তুলে গল্পের আকারে উপস্থাপন করলে তবেই এরা বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হবে। জোর করে তো আর বিজ্ঞান বোঝানো যাবে না। এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান আবার কঠিন একটা বিষয়। তবে কঠিন হলেও মজার। শুধু আকর্ষণটা জাগাতে পারলেই হলো। তিনি রেখার প্রশ্নের চেয়ে বিন্দুর প্রশ্নের দিকে মনোযোগ দিলেন। বললেন পৃথিবীর বয়স প্রায় ৬০০ কোটি।

এত্তো বয়স! সবাই অবাক হয়ে তাকাল।

সীমা বলল-কিন্তু এতো বয়স মাপল কীভাবে?

নীলকান্তবাবু বললেন, তেজস্ক্রিয়তা ব্যবহার করে।

তেজস্ক্রিয়তা কী? এবারে অণু বলল। কিন্তু প্রশ্নটি আসলে সবার মনেই উঁকি দিচ্ছে। তাকিয়ে আছে সবাই।

নীলকান্তবাবু শুরু করলেন-তোমাদের পরমাণুর মডেল এর গল্প বলেছিলাম না? মনে আছে?           পরের অংশ আগামীকাল