সংস্কৃতি এমন একটা উপাদানের নাম যেটার মাধ্যমে একটা জাতিকে চিহ্নিত করা যায়। তাহলে সংস্কৃতি বলতে কি বুঝায়? আসলে সংস্কৃতি হলো, মানুষের জ্ঞান, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, নীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্জিত কীর্তিগুলো। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই প্রত্যেকটি জাতিরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে ঐ জাতিকে চিহ্নিত করা যায়। আর একটা জাতি এসব সংস্কৃতির চর্চা করার মাধ্যমে সমাজ জীবন টিকিয়ে রাখে। একজন মানুষ জন্মসূত্রে সমাজ থেকে সংস্কৃতির উপাদানগুলো পেয়ে থাকে। আর এসব সংস্কৃতিগুলো ভৌগোলিক প্রভাবে প্রভাবিত। যেমন প্রাচ্যের সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিগত অনেক পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়। আমরা যদি বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে দেখতে পাব যে বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ত্রয়োদশ শতাব্দীতে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁও জয় করার পরের ইতিহাস। তখন থেকেই বাঙালি জাতি নিজস্ব একটা জাতি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এরপর কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন জাতি বাঙালিদের বিভিন্ন সময় শাসন করে। আর এই শাসন করার ফলে ঐসব শাসকদের কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বাঙালিদের সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। তবু বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিগুলো টিকে ছিল বেশ ভালোভাবেই। যার বাস্তব চিত্র আমরা ইংরেজ কর্তৃক উপমহাদেশ শাসন আমলে দেখতে পাই। ইংরেজরা এই উপমহাদেশ প্রায় ২০০ বছর শাসন করেছিল কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে শাসন করার ফলেও কিন্তু তারা বাঙালিদের পোশাক, ভাষা ও খাদ্যের কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি। অথচ ইংরেজরা যখন ১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশে স্বাধীনতা অর্জন করল, তখন দেখা যায় শুধু ধর্মের ভিত্তিতে দুটি আলাদা জাতিকে তারা এক করে একটি দেশে পরিণত করল এবং এই স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতি সংস্কৃতিগতভাবে দারুণ আহত হলো এবং তারা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে জানান দিল যে বাঙালি জাতি নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে চায়। যার ফলে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে। বর্তমানে বাংলাদেশে সংস্কৃতিগত বিলুপ্তি চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে কীভাবে, চলুন দেখে নেওয়া যাক, ইংরেজরা ২০০ বছর শাসন করে কিন্তু এই উপমহাদেশে মানুষের সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন তারা আনতে পারেন নাই। অর্থাত্ সে সময়ও বাঙালিরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা বজায় রেখেছিল যেমন তাদের পোশাকে, ভাষায় এবং তাদের বিনোদন জগতে। বাংলাদেশ বিজাতীয় সংস্কৃতি দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত আর এই বিজাতীয় সংস্কৃতি বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছে পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি করা সেই ইলেকট্রিক মিডিয়ার মাধ্যমে। এই ইলেকট্রিক মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বরা খুব সূক্ষ্মভাবে বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংসের কাজ করে যাচ্ছে। আর এসব ইলেকট্রিক মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাঙালিরা তাদের পোশাকে ভাষায় এনেছে পরিবর্তন। আগে যেখানে ছেলেরা পড়ত লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবি, সেখানে এখন তারা শার্ট, প্যান্ট, ইত্যাদি পরিধান করেছে। আর মেয়েদের পোশাকে এসেছে দারুণ পরিবর্তন, তারা শাড়ির বদলে বিভিন্ন ধরনের সালোয়ার-কামিজ ও আধুনিক পোশাক পরিধান করেছে। এছাড়া বাঙালিদের ভাষার ক্ষেত্রে এসেছে দারুণ পরিবর্তন তারা অতিমাত্রায় ইংরেজি সিনেমা এবং হিন্দি সিনেমা দেখার ফলে কথা বলার সময় অতিমাত্রায় এসব ভাষা ব্যবহার করে। একটা জাতি যখন অন্য জাতির সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয় তখন সে জাতি নির্ভরশীল জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়। আর নির্ভরশীল জাতি কখনো উন্নত হতে পারে না। তাই আসুন নির্ভরশীলতা পরিহার করে নিজস্ব সংস্কৃতি বহুলাংশে চর্চা করি এবং নিজ জাতিকে বিশ্বের বুকে সম্মানীয় জায়গায় নিয়ে যেতে সাহায্য করি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়