কড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতি বছর আগাম হজ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সৌদি আরব সরকার। দেশটির সরকারি বার্ত সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) এবং ওকাজ পত্রিকা জানিয়েছে, সৌদি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চলতি বছরের হজ পালনের প্রটোকল ঘোষণা করেছে। প্রটোকল অনুযায়ী চলতি বছর হজে শুধু ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশ নিতে পারবেন। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে এবং ১৮ বছরের নিচে কেউ হজে অংশ নিতে পারবেন না। হজযাত্রী এবং হজকর্মীরা আলাদা ব্যাজ পরিধান করবেন। একে অপর থেকে কমপক্ষে দেড় মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি গ্রুপ হবে ১০০ জনের। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব হজযাত্রী হজে অংশগ্রহণ করবেন, সৌদি আরবে অবতরণের কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া সৌদি আরবে অবতরণের ৭২ ঘণ্টা আগে করা কোভিড-১৯-এর পিসিআর টেস্ট নেগেটিভ রিপোর্ট সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হজ পালন করতে আসা যাত্রীদের সৌদি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। হজযাত্রীদের সৌদি আরবে অবতরণ করার পর তিন দিন, অর্থাত্ ৭২ ঘণ্টা কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে এবং উল্লেখিত সময় শেষে ফের পিসিআর টেস্ট করা হবে। তবে কতসংখ্যক হজযাত্রী চলতি বছর হজ পালন করার সুযোগ পাবেন, এই সংখ্যা জানা না গেলেও হজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয় ও বহির্বিশ্বে করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে সবকিছু। চলতি বছরের হজ গত বছরের ন্যায় এতটা সীমিত পর্যায়ে হবে না। গত বছর করোনা মহামারির কারণে বিশ্বের কোনো দেশ থেকে হজ করার অনুমতি দেয়নি সৌদি সরকার। সীমিতভাবে হজের আনুষ্ঠানিকতা হয়।
এদিকে এ বছর বাংলাদেশিদের হজের সুযোগ দেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি সৌদি আরব। তবে বাংলাদেশ পূর্ণ প্রস্তুতি শুরু করেছে। নিবন্ধিত ৬১ হাজার ২২১ জনের মধ্যে ষাটোর্ধ্বদের বাদ দিয়ে হজের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রায় ৪০ হাজার হজযাত্রী যোগ্য হবেন বলে আশা করছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিবন্ধিত হজযাত্রীদের করোনার টিকা মার্চের মধ্যে প্রথম ডোজ এবং মে মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ব্যবস্থা নেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নিবন্ধিতদের মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সি রয়েছেন ২১ হাজার। আর ১৮ থেকে ৬০-এর মধ্যে ৪০ হাজার।
জানা গেছে, গত সোমবার ধর্মসচিবের সভাপতিত্বে হজের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হজযাত্রী পাঠানোর ক্ষেত্রে চার ধরনের ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গত বছর নিবন্ধিতরা, টিকার দুটি ডোজ সম্পন্নকারীরা, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত নন এবং যারা সুস্থ-সুঠাম দেহের অধিকারী। এর বাইরে সৌদি আরব যদি নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা বেঁধে দেয়, সে বিষয়টিও যুক্ত হবে। বৈঠকে টিকা নিবন্ধনে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বদলে পাসপোর্ট অনুযায়ী নিবন্ধনের প্রস্তাব করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য গত বছর ১ লাখ ৩৭ হাজার হজযাত্রীর কোটা নির্ধারিত ছিল। নিবন্ধিত ছিলেন ৬১ হাজার ২৩১ জন। এর মধ্যে সরকারি ২ হাজার ৯৬০ জন এবং বেসরকারি ৫৮ হাজার ২৭১ জন। এর বাইরে এ পর্যন্ত হজে যেতে আগ্রহীদের মধ্যে প্রাকিনবন্ধন করে রেখেছেন ১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭১ জন। এর মধ্যে সরকারি ৪ হাজার ৬৯৫ জন এবং বেসরকারি ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৬ জন।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেন, ‘পবিত্র কাবা শরিফে প্রতি তিন ফুট দূরত্ব রেখে একসঙ্গে কত জন হজ পালন করতে পারবেন, সে বিষয়ে সৌদি সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এর ওপর ভিত্তি করে হয়তো কোন দেশ থেকে কত হজযাত্রী নেওয়া হবে, তার সংখ্যা নির্ধারিত হবে। আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখতে চাই।’ ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতিতে এবারের পবিত্র হজ পালন নিয়ে দ্বিধা ও শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। দেশের ১০ হাজার মানুষ এবার হজ পালনের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এ নিয়ে এখনো সৌদি সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয়নি। চুক্তি কবে হবে, সেই নির্দেশনা এখন পর্যন্ত আসেনি। যারা হজে যেতে পারবেন না, তারা নিবন্ধনের অর্থ ফেরত নিতে পারবেন।’
হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি আলহাজ এম শাহাদত হোসাইন তসলিম ইত্তেফাককে জানান, ‘করোনার কারণে স্বাভাবিক হজ-ওমরাহ বন্ধ থাকায় তাদের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এ বছর সীমিতসংখ্যক হজযাত্রী নিতে পারে সৌদি সরকার। এরই অংশ হিসেবে সৌদি সরকার কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে আছে আগাম প্রস্তুতি, দিকনির্দেশনা, সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রী মোহাম্মদ বেনতেনকে বরখাস্ত এবং হজ-সংশ্লিষ্ট কিছু খাতে প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আশা করি সংখ্যায় অল্প হলেও এবার কিছু বাংলাদেশি হজ পালনের সুযোগ পাবেন। আমাদের এজেন্সিগুলো প্রস্তুতি শুরু করছে।’ চলতি বছরের ২১ জুলাই পবিত্র হজ অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে।