কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা পরিকল্পনা

ফায়ারিং স্কোয়াডে ১৪ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশস্থলের পাশে বোমা পুঁতে রাখার অভিযোগে করা মামলায় ১৪ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। দণ্ডিতরা সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) নেতাকর্মী। প্রায় ২১ বছর আগের এই মামলায় গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান এ রায় দেন। রায়ে ১৪ জঙ্গির  প্রত্যেকের  মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয়েছে ‘ফায়ারিং স্কোয়াডে’ বা গুলি করে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো :মো. আজিজুল হক ওরফে শাহনেওয়াজ, মো. লোকমান, মো. ইউসুফ ওরফে মোছহাব মোড়ল, মোছহাব হাসান ওরফে রাশু, শেখ মো. এনামুল হক, মো. মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ, মো. মাহমুদ আজহার ওরফে মামুনুর রশিদ, মো. রাশেদুজ্জামান ওরফে শিমুল, মো. তারেক, মো. ওয়াদুদ শেখ ওরফে গাজী খান, মো. আনিসুল ইসলাম, সারোয়ার হোসেন মিয়া, মাওলানা আমিরুল ইসলাম ওরফে জেন্নাত মুন্সী ও মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। আসামিদের মধ্যে প্রথম ৯ জন কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণার আগে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাদের আবার কারাগারে পাঠানো হয়। পরের পাঁচ জন পলাতক রয়েছে। আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।আদালত যা বলেছে :রায়ে আদালত বলেছে, প্রকাশ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে আসামিদের  প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ প্রদান করা হলো। তবে ফায়ারিং স্কোয়াডে দণ্ড কার্যকর করা না গেলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশও দেয় আদালত। আদালত বলেছে, নির্দেশ মোতাবেক তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে কর্তৃপক্ষের কোনো অসুবিধার কারণ থাকলে প্রচলিত নিয়মানুসারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

আদালত রায়ে আরো বলেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ইচ্ছা করলে রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন-২০০২-এর ১৪ ধারা অনুসারে হাইকোর্ট ডিভিশনে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করতে পারবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক প্রদত্ত দণ্ড অনুমোদনের জন্য অবিলম্বে রায়সহ নথি হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হোক।

রায়ের পর্যবেক্ষণ

রায়ের পর্যবেক্ষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার প্রসঙ্গও উঠে আসে। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এলে ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্নভাবে তাকে ২০ বার হত্যাচেষ্টায় লিপ্ত হয়। আসামিদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষণে আদালত আরো বলেছে, মুফতি হান্নানের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে বৈধ সরকারকে উত্খাত করার জন্য শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ঐ বছরের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলে হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হুজির হত্যাচেষ্টার প্রথম ঘটনা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ২০০০ সালের ২০ জুলাই, দ্বিতীয় ঘটনা খুলনায় ২০০১ সালের ৩০ মে, তৃতীয় ঘটনা সিলেটে ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এবং চতুর্থ ঘটনা ঢাকায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। এ কারণে হুজি ও জেএমবিসহ আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে উল্লেখিত ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে বলে অত্র ট্রাইবু্যুনাল মনে করে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রপক্ষের আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হলো। এদিকে ঢাকা মহানগর আদালতের পিপি আবদুল্লাহ আবু বলেছেন, ‘ন্যায়বিচার পেয়েছি। এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ২১ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুত্ফর রহমান আদর্শ কলেজ মাঠে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশ থেকে ৭৬ কেজি ওজনের একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। পরদিন ঐ স্থানেই শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। ঐ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা, ষড়যন্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে কোটালীপাড়া থানায় তিনটি মামলা করে পুলিশ। এর মধ্যে হত্যাচেষ্টা মামলায় ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) ১০ নেতাকর্মীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয় ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আপিলের রায়েও ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। যাবজ্জীবন সাজার এক আসামি এবং ১৪ বছর কারাদণ্ডের দুই আসামির সাজাও বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছর সাজার এক আসামিকে খালাস দেয় হাইকোর্ট। আর হত্যার ষড়যন্ত্র মামলায় ২০০১ সালের ১৫ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। আদালত ২০০৪ সালে ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। রাষ্ট্রপক্ষে ৫০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হলে ১১ মার্চ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। সেই শুনানি শেষে বিচারক ২৩ মার্চ রায়ের দিন ধার্য রাখেন।