১১ মৃত্যু, নিখোঁজ ৪০০

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। আরো মৃত্যুর খবর থাকলেও নিশ্চিত না হওয়ায় তা হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে। মৃতদের মধ্যে ক্যাম্প-৮-এর ই-তে একজন, একই ক্যাম্পের ডব্লিউ ব্লকে পাঁচ জন এবং ক্যাম্প-৯-এ পাঁচ জন মারা গেছেন। তবে নিহতদের পরিচয় জানা যায়নি। এ সময় নানাভাবে আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৫০০ জন। এছাড়া এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪০০ রোহিঙ্গা। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে প্রায় ১০ হাজার বসতঘর। এতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় অর্ধলাখ রোহিঙ্গা। এসময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাসপাতাল, বিতরণ কেন্দ্র, শিখন কেন্দ্র, মহিলাবান্ধব পরিষেবাসহ প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো।

গতকাল মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টায় সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মহসীন এসব তথ্য জানিয়েছেন। কক্সবাজার ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে ক্যাম্পে বার বার অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ত্রাণ সচিব বলেন, সোমবারের অগ্নিকাণ্ডটি স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। বিষয়টি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ অগ্নিকাণ্ডের রহস্য বের করার পাশাপাশি আগের অগ্নিকাণ্ডগুলোও খতিয়ে দেখা হবে। মানবিক সহযোগিতা দিতে গিয়ে বার বার ঘটা এ ঘটনা যদি পরিকল্পিত হয় তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এর আগে দুপুরের দিকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন। এসময় ডিআইজি সাংবাদিকদের বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

এদিকে ক্যাম্পে কাজ করা এনজিওদের সমন্বয়কারী সংস্থা ‘ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেটর গ্রুপ-আইএসসিজির যোগাযোগ ও গণসংযোগ কর্মকর্তা সাইয়্যেদ মো. তাফহীম বিকাল ৪টার দিকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, প্রাথমিক পরিসংখ্যানে উখিয়ার বালুখালি রোহিঙ্গা ৮-ই ও ডব্লিউ, ৯ ও ১০ এ- এই  চার ক্যাম্পে সোমবারের অগ্নিকাণ্ডে ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে নানা বয়সি প্রায় ৪০০ রোহিঙ্গা। ক্যাম্পে কাজ করা এনজিওর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের সমন্বয়ে এ তথ্য জানা গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কিন্তু ত্রাণ সচিবের ব্রিফিংয়ের পর আইএসসিজির ঐ কর্মকর্তা মৃতের সংখ্যার সরকারি হিসাবটাই আমলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আরেকটি বার্তা পাঠান। সেই বার্তায় তিনি আরো জানান, অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ঘর পুড়ে গিয়ে প্রায় অর্ধলাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। আরো কয়েক দিন তদন্তের পর সর্বশেষ রিপোর্ট প্রদানকালে মৃত, আহত, নিখোঁজ এবং বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরিসংখ্যান আরো বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।   

কক্সবাজারের অতিরিক্ত ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. শামসুদ্দোজা নয়ন জানান, ঘটনাস্থলে প্রশাসনের কয়েক স্তরের কর্মকর্তা উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি তদারকি করছেন। প্রাথমিক হিসেবে ঘর পুড়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, আগুনে পুড়ে গেছে কয়েক শ বাংলাদেশি পরিবারের বসতবাড়িও। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবিও বিরামহীন কাজ করেছে। 

উল্লেখ্য, সোমবার বিকাল ৪টার দিকে উখিয়ার বালুখালী ৮-ই ও ডব্লিউ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায় পাশের ৯ ও ১০ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও। সর্বশেষ রাত ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুড়ে যায় প্রায় সাড়ে ১০ হাজারেরও বেশি ঘর। এছাড়া পুড়ে গেছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও অফিস ও পুলিশ ব্যারাক।

দুর্যোগ ও ত্রাণ সচিব মো. মহসীন আরো জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্পসহ পুরো ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ, আর্মড পুলিশ নিযুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক খোঁজ রেখেছেন। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে অসমর্থিত একটি সূত্র মতে, এক শ্রেণির রোহিঙ্গাই বিভিন্ন ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটান বলে অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতন ও তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার করা মামলায় রোহিঙ্গাদের অপরাধী ও উগ্রবাদী হিসেবে প্রমাণের লক্ষ্যে মিয়ানমার বিপথগামী রোহিঙ্গাদের দিয়ে এসব অপকর্ম করাচ্ছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।