প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাইবাছাইয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং স্থানীয় রাজনীতিক চাপে অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বার ও সংরক্ষিত মেম্বারদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও জোরপূর্বক মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য এখন প্রার্থীদের ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনি মাঠে প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও শঙ্কা কাজ করছে। নির্বাচনি কর্মকর্তাদের কাছে দ্বারস্থ হয়ে বিচার পাচ্ছেন না প্রার্থীরা। এই পরিস্থিতি এখন দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের। খবর স্থানীয় প্রতিনিধিদের।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকের বাইরে এবারের ইউপি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্দলীয় মেম্বার ও সংরক্ষিত মেম্বার পদের নির্বাচনে স্থানীয়ভাবে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে। নির্দলীয় দুটি পদে অলিখিত দলীয় মনোনয়নের কারণে নির্বাচনি পরিবেশ একপেশে হয়ে গেছে। ফলে গ্রামের জনপ্রিয় এবং স্বচ্ছ ইমেজের প্রার্থীরা আতঙ্কে আছেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের কারণে স্বতন্ত্র বা অন্য দলের প্রার্থীরাও নির্বাচনি মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
ইউপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী একাধিক প্রার্থী ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, প্রভাবশালীদের প্রভাবে নির্বাচনি পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। মনোনয়ন বাছাইয়ে তার প্রভাব দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বাইরে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের মনোনয়ন সামান্য ভুল দেখিয়ে বাতিল করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৫৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন সামান্য কারণে বাতিল করা হয়েছে। মনোনয়ন বাতিলের পর এখন বৈধ ইমেজধারী প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে জমজমাট নির্বাচন হলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এখানে যত প্রার্থী থাকবে নির্বাচনের আমেজ তত বাড়বে। অথচ নির্বাচনের আগেই অবৈধ চাপ প্রয়োগের ঘটনা নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করছে। ভালো প্রার্থীরা নির্বাচনে যেতে অনুত্সাহিত হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো নির্বাচনি দায়িত্বে যারা আছেন তারাও ক্ষমতাসীন রাজনীতিক দলের স্থানীয় নেতাদের কথা মতো কাজ করছেন। কোনো প্রকার প্রতিকার মিলছে না।
এদিকে আতঙ্ক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হচ্ছে আজ বুধবার। আগামীকাল বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেবেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা। এরপরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণায় নামবেন চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থীরা। এ নির্বাচনে তিন পদে মোট বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ১৩৬ জন। চেয়ারম্যান পদে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১৬৮০ জন। এছাড়া সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে বৈধ প্রার্থী সংখ্যা ৪২৫০ জন ও সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য পদে প্রার্থী সংখ্যা ১৪২০৬ জন। চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী রয়েছেন ৩১ ইউপিতে। আজ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হলে একক প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষে এই সংখ্যা বাড়তেও পারে।
এদিকে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপে ৩৯ রাজনৈতিক দলের মধ্যে অংশ নিচ্ছে মাত্র ১১টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ-জাপাসহ তিন দলের প্রার্থী বেশি থাকলেও নামে মাত্র নির্বাচন অংশ নিচ্ছে আটটি দল। ইসি জানিয়েছে, ৩৭১ ইউপির মধ্যে একটি করে ইউপিতে চেয়ারম্যান প্রার্থী দিয়েছে তিন দল। আর তিন জন করে প্রার্থী দিয়েছে দুই দল। ছয় জন করে প্রার্থী দিয়েছে দুই দল। আর ১৫ জন প্রার্থী দিয়েছে একটি দল।
ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম ধাপের ৩৭১ ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দিয়েছে ৩৫৮ ইউপিতে, বাছাই বাদ পড়েছে চার প্রার্থী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী দিয়েছে ২২৭ ইউপিতে, বাছাইয়ে বাদ পড়েছে ১০ প্রার্থী। জাতীয় পার্টি-জাপা প্রার্থী দিয়েছে ৩২ ইউপিতে, বাদ পড়েছে এক জন প্রার্থী। জাকের পার্টি-প্রার্থী দিয়েছে ১৫ ইউপিতে, বাদ পড়েছে দুই জন প্রার্থী। চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন-১০৯৭ জন, বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন ৫৩ জন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিতরা স্বতন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে এ নির্বাচন অংশ নিচ্ছেন। তবে বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালেও এই দলের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি-জেপি প্রার্থী দিয়েছে ছয় ইউপিতে, জাসদ-৩, বিকল্পধারা-৩, ওয়ার্কার্স পার্টি-৬, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-১, কমিউনিষ্ট পার্টি-১ ও বাংলাদেশ কংগ্রেস-১ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দিয়েছে।
ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে চেয়ারম্যান পদে ১৭৫০ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ১০৯৭ জন ও দলীয় প্রার্থী ছিলেন ৬৫৩ জন। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে ৭০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। সেই হিসেবে বর্তমানে চেয়ারম্যান পদে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ১৬৮০ জন। এছাড়া সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা ৪২৫০ জন, সাধারণ ওয়ার্ডে সদস্য পদে প্রার্থী সংখ্যা ১৪২০৬ জন। চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী রয়েছে ৩১ ইউপিতে।
১১ এপ্রিল প্রথম ধাপে ৩৭১ ইউপিতে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ভোট হবে। একই দিন ১১ পৌরসভা ও একটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন রয়েছে।