রাজশাহীর বাঘায় গত দেড় মাসে ২৮ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করিয়াছেন। ইহার মধ্যে ২১ জনই শিক্ষার্থী। ইত্তেফাকের এই ছোট্ট খবরটি করোনাকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের ভগ্নদশার চিত্রটিকেই স্পষ্ট করিয়া দিতেছে। সরেজমিনে নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবার ও সহপাঠীদের সহিত কথা বলিয়া জানা গিয়াছে, বিষণ্নতা, শিক্ষাজীবন লইয়া হতাশা, বন্ধুত্ব সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন এবং চাকুরি লইয়া অনিশ্চয়তাসহ প্রণয়ঘটিত ব্যর্থতার কারণে এই ২৮ জন বিষপানে আত্মহননের চেষ্টা করিয়াছেন। দুই সপ্তাহ পূর্বে প্রকাশিত আরো একটি রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে যে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যার ঘটনা ৪৪ ভাগ বৃদ্ধি পাইয়াছে। একটি বেসরকারি ফাউন্ডেশনের জরিপে এই চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে।
বিগত এক বত্সরে করোনার প্রথম ঢেউ সুনামির মতো আমাদের অনেকের জীবনকে তছনছ করিয়া দিয়াছে। দেশে কোটির কাছাকাছি মানুষ কর্মহীন হইয়াছেন। নূতন করিয়া গরিব হইয়াছেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ। সুতরাং বিগত এক বত্সরে মানুষের মনের চাপ বাড়িয়াছেন বেশ কয়েক গুণ। যাহারা তুলনামূলক তরুণ—তাহাদের অনেকের জীবনের সময়ের কাঁটা যেন থমকাইয়া গিয়াছে। স্তব্ধ সেই কাঁটা তাহাদের জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করিয়াছে। অতঃপর যাপিত অমারজনির মধ্যে কোনো আলোকশিখার উত্স দেখিতে না পাইয়া অনেকেই জীবনপ্রদীপ নিভাইয়া দিতে চাহিয়াছেন স্ব-ইচ্ছায়। ইহা অত্যন্ত দুঃখজনক পরিস্থিতি। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংসার-সাগরে দুঃখ-তরঙ্গের মধ্যে ‘আশা’ই হইল একমাত্র ভেলা। সেই আশার ভেলা যদি ডুবিয়া যায়, তখন খড়কুটা আঁকড়াইয়া ধরিবার মতো আর কিছু না পাইয়া মানুষ অবশেষে আত্মহত্যা করিয়া বসে। অথচ সকল ধর্মেই বলা হইয়াছে—আত্মহত্যা মহাপাপ নরকে গমন; কিন্তু ‘পৃথিবী’টাই কাহারো নিকট নরক হইয়া গেলে সে বোধহয় আর কোনো নরকের ভয় পায় না। কিছুদিন পূর্বে একটি বৈশ্বিক সমীক্ষায় জানা গিয়াছে, বিশ্বে পূর্বের চাইতে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অধিক অবনতি হইয়াছে। মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা, রাগ, দুঃখ ও দুশ্চিন্তা বাড়িয়াছে। বিশ্বের ১৪০টি দেশের প্রায় দেড় লক্ষ লোকের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে সমীক্ষাটি করিয়াছিল যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ।
মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হইয়াছে কিংবা দুঃখ বাড়িয়াছে—ইহার সরল অর্থ হইল, মানুষের মনে স্বস্তি কমিয়াছে। সাম্প্রতিক বিশ্বে যে অস্থির এবং অশান্তির বাতাবরণ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা প্রতিফলনও ঘটিতেছে ব্যক্তিমানসে। কিছুদিন পূর্বে বিশ্বের ১৭টি রাষ্ট্রে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, প্রতি ২০ জন মানুষের মধ্যে এক জন বিষণ্নতায় ভুগিতেছে। সেই হিসাবে সমগ্র বিশ্বে এই মুহূর্তে ৩৫ কোটি মানুষ ভুগিতেছে বিষণ্নতাজনিত অসুখে। করোনা আসিয়া মানসিক স্বাস্থ্যের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হইয়া গিয়াছে। আশঙ্কার কথা হইল, করোনার বেশ কয়েকটি নূতন ধরন নূতন করিয়া সমগ্র বিশ্বের জন্য মাথাব্যথার কারণ হইয়া উঠিয়াছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের আরো কতভাবে কত দিন ধরিয়া নাকানিচুবানি খাওয়াইবে, তাহা কেহই বলিতে পারিতেছে না। এইদিকে, মানসিক স্বাস্থ্যের যেই সকল জটিল সমস্যা বাংলাদেশে বিরাজমান, প্রয়োজন অনুযায়ী তাহার চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয় নাই। তাহা ছাড়া মানসিক সমস্যাকে গরিব জনগোষ্ঠী গুরুত্বই দেয় না। ইহা যেন তাহাদের নিকট কপর্দকশূন্য অবস্থায় অভুক্ত পেটে ভাত না খাইয়া চা খাইবার মতো। মনে রাখিতে হইবে, মানুষ প্রধানত তাহার মানসিক জগত্ লইয়া বাঁচিয়া থাকে। আর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি তথা মনের মধ্যে অসুখ দানা বাঁধিলে তাহার মতো বিপজ্জনক সমস্যা খুব অধিক নাই। এই অবস্থায় আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।